জাপানের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই বড় চমক এনে দিয়েছেন দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে। দায়িত্ব নেওয়ার একশ দিনেরও কম সময়ের মাথায় তিনি সংসদের নিম্নকক্ষ ভেঙে আগামী ফেব্রুয়ারির শুরুতে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। জাপানের যুদ্ধোত্তর ইতিহাসে এটিই হতে যাচ্ছে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত নির্বাচনী প্রচারণা। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক আলোচনা ও হিসাবনিকাশ।
নেতৃত্বের বৈধতা চাইছেন প্রধানমন্ত্রী
গত অক্টোবর মাসে ক্ষমতায় এসে জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়েন তাকাইচি সানায়ে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন জনমত জরিপে তাঁর সরকারের জনপ্রিয়তা ধারাবাহিকভাবে সত্তরের ঘরে অবস্থান করছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাঁর নেতৃত্ব এবং নতুন ক্ষমতাসীন জোটকে জনগণ কতটা সমর্থন করে, তা জানতেই এই নির্বাচন। তাঁর ভাষায়, তাকাইচি সানায়ে প্রধানমন্ত্রী থাকবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত জনগণের হাতেই থাকা উচিত।
অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনী মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আক্রমণাত্মক শিল্পনীতি, আত্মরক্ষামূলক সংস্কার, কর ছাড় এবং কড়াকড়ি ব্যয়ের নীতির অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমাতে সম্প্রতি একটি অতিরিক্ত বাজেটও ঘোষণা করা হয়েছে। এই সম্প্রসারণমূলক নীতির ইঙ্গিতেই আর্থিক বাজারে বড় প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানো বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগেরই প্রতিফলন।

ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বনাম দলের দুর্বলতা
তাকাইচির বড় ভরসা তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা। বিশেষ করে ত্রিশের নিচে বয়সী ভোটারদের মধ্যে তাঁর সরকারের প্রতি সমর্থন নব্বই শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে বলে এক জরিপে উঠে এসেছে। সাধারণ ঘরের ভাষা, সোজাসাপ্টা বক্তব্য এবং আগের পুরুষপ্রধান নেতৃত্বের তুলনায় ভিন্ন ব্যক্তিত্ব তাঁকে আলাদা করে তুলেছে। তবে সমস্যা অন্য জায়গায়। জাপানের দীর্ঘদিনের শাসক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভাবমূর্তি সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত। তাকাইচি জনপ্রিয় হলেও দলটি এখনো অনেক ভোটারের কাছে অনাকর্ষণীয়।
জোট রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ
দীর্ঘ ছাব্বিশ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে আগের জোটসঙ্গী কোমেইতো দল আলাদা হয়ে যাওয়ায় ক্ষমতাসীন শিবির দুর্বল হয়েছে। দলের ভেতরেও আগাম নির্বাচনের সময় নিয়ে সংশয় রয়েছে। কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা প্রকাশ্যেই এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, জনপ্রিয়তার ঢেউ খুব দ্রুত থেমে যেতে পারে।
বিরোধীদের নতুন হিসাব
এই সুযোগ নিতে প্রস্তুত বিরোধীরা। মধ্য-বাম সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক দল কোমেইতোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুন কেন্দ্রপন্থী জোট গঠন করেছে। বৌদ্ধ ধর্মীয় সংগঠনের সমর্থন থাকায় এই জোট কিছু আসনে শক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি নতুন ধারার জনতাবাদী দলগুলোও চাপ বাড়াচ্ছে। অভিবাসন ও মূল্যস্ফীতির মতো ইস্যু তাদের শক্তি জোগাচ্ছে, যদিও তাকাইচির ক্ষমতায় আসার পর সাময়িকভাবে তাদের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে।
ঝুঁকির কথা জানেন তাকাইচি
প্রধানমন্ত্রী নিজেও জানেন, এই বাজি খুব সহজ নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেলে তিনি নিজের পছন্দের নীতি বাস্তবায়নে অনেক বেশি স্বাধীনতা পাবেন। তবে ব্যর্থ হলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই নির্বাচনে তিনি নিজের প্রধানমন্ত্রীত্বকেই বাজিতে রেখেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















