০৭:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চাকরি শেষ নয়, বরং বাড়ছে কাজের মূল্য

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন নিয়ে অফিসভিত্তিক কর্মীদের মধ্যে ভয় আর উত্তেজনা একসঙ্গে কাজ করছে। অনেকের আশঙ্কা, এই প্রযুক্তি চাকরি কেড়ে নেবে। আবার করপোরেট দুনিয়ায় খরচ কমানোর স্বপ্ন দেখছেন ব্যবস্থাপকরা। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অফিসের কাজ মুছে দিচ্ছে না, বরং কাজের ধরন বদলে দিয়ে কর্মীদের গুরুত্ব ও পরিধি বাড়াচ্ছে।

ভয় আর সম্ভাবনার যুগলবন্দি

চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তি আসার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান সতর্ক করেছেন, শ্রমবাজারে বড় ঢেউ তুলছে এই প্রযুক্তি। বড় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, ভবিষ্যতে কর্মীসংখ্যা কমতে পারে। আবার প্রযুক্তি খাতের কিছু নেতা ধারণা দিচ্ছেন, নতুন প্রজন্মের সাদা কলারের চাকরির বড় অংশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব মন্তব্য উদ্বেগ বাড়ালেও সাম্প্রতিক তথ্য অন্য ছবি তুলে ধরছে।

বাস্তবে চাকরি কমেনি, বরং বেড়েছে

সাম্প্রতিক তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবস্থাপনা, পেশাগত, বিক্রয় ও দাপ্তরিক খাতে প্রায় ত্রিশ লক্ষ নতুন সাদা কলারের চাকরি যোগ হয়েছে। একই সময়ে নীল কলারের কর্মসংস্থান প্রায় স্থির। যেসব পেশাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রথম শিকার বলা হচ্ছিল, সেগুলোতেই দেখা যাচ্ছে বিস্তার। সফটওয়্যার উন্নয়ন, চিকিৎসা বিশ্লেষণ এবং আইনি সহায়তার মতো খাতে কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাবেই মূলত কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের নিয়োগে গতি কমেছে।

মজুরি ও মর্যাদার উত্থান

চাকরির পাশাপাশি আয়েও সাদা কলারের অবস্থান শক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পেশাগত ও ব্যবসায়িক সেবায় প্রকৃত মজুরি বেড়েছে। দাপ্তরিক কর্মীদের আয় আরও দ্রুত হারে উঠেছে। শিক্ষা, বয়স ও অন্যান্য সামাজিক সূচক বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, সাদা কলারের আয় এখন নীল কলারের তুলনায় প্রায় এক তৃতীয়াংশ বেশি। এই ব্যবধান আশির দশকের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।

ইতিহাসের আয়নায় প্রযুক্তির প্রভাব

কম্পিউটার যুগের শুরুতেও এমন আতঙ্ক দেখা গিয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, যন্ত্র মানুষের মানসিক কাজ দখল নেবে। বাস্তবে দেখা গেছে, কম্পিউটার একঘেয়ে কাজ কমিয়ে মানুষের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে আরও মূল্যবান করেছে। বিমান নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে করপোরেট পরিকল্পনা, সবখানেই মানুষের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমা ও শক্তি

নতুন প্রযুক্তি আগের চেয়ে বেশি সক্ষম হলেও এখনো অসম দক্ষতায় ভুগছে। কোনো কাজের অধিকাংশ অংশে ভালো হলেও জটিল সিদ্ধান্ত ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে মানুষের বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য। গবেষণা বলছে, খুব অল্প কিছু পেশায়ই কাজের বড় অংশ পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব।

নতুন কাজ, নতুন পরিচয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু পুরোনো কাজ বদলাচ্ছে না, নতুন পেশাও তৈরি করছে। তথ্য চিহ্নিতকরণ, প্রযুক্তি বাস্তবায়ন পরামর্শ, এমনকি শীর্ষ পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক নেতৃত্বের পদ সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব পেশার নামই ঠিকভাবে স্থির হয়নি, সেগুলোর কর্মসংস্থান ও মজুরি সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে।

ঝুঁকি আছে, ধ্বংস নয়

তবে সব পেশা সমান নিরাপদ নয়। একঘেয়ে দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিতদের সংখ্যা কমছে। বিশেষ করে যাদের দক্ষতা সীমিত ও স্থানান্তরযোগ্য নয়, তাদের জন্য পরিবর্তন কষ্টকর হতে পারে। তবু এই রূপান্তরকে সর্বগ্রাসী বিপর্যয় বলা যাচ্ছে না। মানুষ ও যন্ত্রের যৌথ কাজই আপাতত সবচেয়ে বেশি মূল্য তৈরি করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অফিসের কাজ নতুনভাবে আঁকছে। কিন্তু চাকরি মুছে দিচ্ছে না। মানুষের দায়বদ্ধতা, বিচারবুদ্ধি ও অভিযোজন ক্ষমতাই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদের পথে আমেরিকার নতুন দৌড়, অর্ধশতাব্দী পর আবার মানুষ ফিরছে মহাকাশ অভিযানে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চাকরি শেষ নয়, বরং বাড়ছে কাজের মূল্য

০৬:০০:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন নিয়ে অফিসভিত্তিক কর্মীদের মধ্যে ভয় আর উত্তেজনা একসঙ্গে কাজ করছে। অনেকের আশঙ্কা, এই প্রযুক্তি চাকরি কেড়ে নেবে। আবার করপোরেট দুনিয়ায় খরচ কমানোর স্বপ্ন দেখছেন ব্যবস্থাপকরা। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অফিসের কাজ মুছে দিচ্ছে না, বরং কাজের ধরন বদলে দিয়ে কর্মীদের গুরুত্ব ও পরিধি বাড়াচ্ছে।

ভয় আর সম্ভাবনার যুগলবন্দি

চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তি আসার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান সতর্ক করেছেন, শ্রমবাজারে বড় ঢেউ তুলছে এই প্রযুক্তি। বড় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, ভবিষ্যতে কর্মীসংখ্যা কমতে পারে। আবার প্রযুক্তি খাতের কিছু নেতা ধারণা দিচ্ছেন, নতুন প্রজন্মের সাদা কলারের চাকরির বড় অংশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব মন্তব্য উদ্বেগ বাড়ালেও সাম্প্রতিক তথ্য অন্য ছবি তুলে ধরছে।

বাস্তবে চাকরি কমেনি, বরং বেড়েছে

সাম্প্রতিক তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবস্থাপনা, পেশাগত, বিক্রয় ও দাপ্তরিক খাতে প্রায় ত্রিশ লক্ষ নতুন সাদা কলারের চাকরি যোগ হয়েছে। একই সময়ে নীল কলারের কর্মসংস্থান প্রায় স্থির। যেসব পেশাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রথম শিকার বলা হচ্ছিল, সেগুলোতেই দেখা যাচ্ছে বিস্তার। সফটওয়্যার উন্নয়ন, চিকিৎসা বিশ্লেষণ এবং আইনি সহায়তার মতো খাতে কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাবেই মূলত কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের নিয়োগে গতি কমেছে।

মজুরি ও মর্যাদার উত্থান

চাকরির পাশাপাশি আয়েও সাদা কলারের অবস্থান শক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পেশাগত ও ব্যবসায়িক সেবায় প্রকৃত মজুরি বেড়েছে। দাপ্তরিক কর্মীদের আয় আরও দ্রুত হারে উঠেছে। শিক্ষা, বয়স ও অন্যান্য সামাজিক সূচক বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, সাদা কলারের আয় এখন নীল কলারের তুলনায় প্রায় এক তৃতীয়াংশ বেশি। এই ব্যবধান আশির দশকের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।

ইতিহাসের আয়নায় প্রযুক্তির প্রভাব

কম্পিউটার যুগের শুরুতেও এমন আতঙ্ক দেখা গিয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, যন্ত্র মানুষের মানসিক কাজ দখল নেবে। বাস্তবে দেখা গেছে, কম্পিউটার একঘেয়ে কাজ কমিয়ে মানুষের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে আরও মূল্যবান করেছে। বিমান নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে করপোরেট পরিকল্পনা, সবখানেই মানুষের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমা ও শক্তি

নতুন প্রযুক্তি আগের চেয়ে বেশি সক্ষম হলেও এখনো অসম দক্ষতায় ভুগছে। কোনো কাজের অধিকাংশ অংশে ভালো হলেও জটিল সিদ্ধান্ত ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে মানুষের বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য। গবেষণা বলছে, খুব অল্প কিছু পেশায়ই কাজের বড় অংশ পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব।

নতুন কাজ, নতুন পরিচয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু পুরোনো কাজ বদলাচ্ছে না, নতুন পেশাও তৈরি করছে। তথ্য চিহ্নিতকরণ, প্রযুক্তি বাস্তবায়ন পরামর্শ, এমনকি শীর্ষ পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক নেতৃত্বের পদ সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব পেশার নামই ঠিকভাবে স্থির হয়নি, সেগুলোর কর্মসংস্থান ও মজুরি সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে।

ঝুঁকি আছে, ধ্বংস নয়

তবে সব পেশা সমান নিরাপদ নয়। একঘেয়ে দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিতদের সংখ্যা কমছে। বিশেষ করে যাদের দক্ষতা সীমিত ও স্থানান্তরযোগ্য নয়, তাদের জন্য পরিবর্তন কষ্টকর হতে পারে। তবু এই রূপান্তরকে সর্বগ্রাসী বিপর্যয় বলা যাচ্ছে না। মানুষ ও যন্ত্রের যৌথ কাজই আপাতত সবচেয়ে বেশি মূল্য তৈরি করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অফিসের কাজ নতুনভাবে আঁকছে। কিন্তু চাকরি মুছে দিচ্ছে না। মানুষের দায়বদ্ধতা, বিচারবুদ্ধি ও অভিযোজন ক্ষমতাই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থাকবে।