ক্যামোফ্লাজ পোশাক পরে ধুলোমাখা তাঁবু আর গাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক কলম্বীয় যুবক ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন—বিদেশে যুদ্ধের কাজে ভালো পারিশ্রমিক মিলবে। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই আগ্রহী মানুষের মন্তব্যে ভরে যায়। এই দৃশ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি এমন এক বৈশ্বিক সশস্ত্র শ্রমবাজারের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় কলম্বিয়ার সাবেক সেনারা জড়িয়ে পড়ছেন দূরদেশের সংঘাতে।
বিদেশের যুদ্ধে কলম্বীয়দের উপস্থিতি
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে কয়েক হাজার কলম্বীয় যোদ্ধা ইউক্রেনে গেছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। কেউ লড়েছে এক পক্ষের হয়ে, কেউ অন্য পক্ষের হয়ে। পাশাপাশি সুদানের গৃহযুদ্ধ কিংবা মেক্সিকোর সহিংস অপরাধচক্রেও তাদের দেখা মিলছে। মোট মিলিয়ে প্রায় দশ হাজার কলম্বীয় বিভিন্ন বিদেশি সংঘাতে যুক্ত থাকতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনুমান।
এদের বড় অংশই সাবেক সেনাসদস্য। কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত হন, কেউ অপরাধী গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করেন বেশি অর্থের আশায়, আবার কেউ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন বিদেশি বাহিনী বা ঠিকাদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে। দীর্ঘদিনের গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং পাশ্চাত্য সামরিক মানের অস্ত্রব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিতি তাদের চাহিদা বাড়িয়েছে। তুলনামূলক কম খরচে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য হওয়াও বড় কারণ।
অবসরের পর অনিশ্চিত জীবন
কলম্বিয়ার সেনাবাহিনীতে বিপুল সদস্যসংখ্যা থাকলেও অবসরের পর তাদের জন্য সমন্বিত সহায়তা কাঠামো দুর্বল। সেনাবাহিনী ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা হারান। সামান্য পেনশনে জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীতে বিদেশি চুক্তিতে বহু গুণ বেশি আয়ের প্রতিশ্রুতি তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনও পরিস্থিতি জটিল করেছে। শান্তি আলোচনা ও নিরাপত্তা সংস্কারের উদ্যোগ সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ তৈরি করেছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজার হাজার সেনা স্বেচ্ছায় বাহিনী ছেড়েছেন, যা বিদেশমুখী প্রবণতাকে আরও বাড়িয়েছে।
প্রতারণা, মৃত্যু ও মানসিক ক্ষত
বিদেশে কাজের প্রলোভনে অনেকেই কম ঝুঁকির নিরাপত্তা দায়িত্ব ভেবে চুক্তি করেন, কিন্তু বাস্তবে চলে যান যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক নিয়োগে পারিশ্রমিক ও সুবিধা নিয়ে অতিরঞ্জন সাধারণ ঘটনা। ভাষাগত বাধা, অচেনা কমান্ড কাঠামো এবং ড্রোন ও ভারী অস্ত্রনির্ভর আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র তাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। নিহতদের পরিবার অনেক সময় ক্ষতিপূরণও পায় না।
ফিরে আসা অনেকের শরীরে গুরুতর আঘাত, মনে গভীর মানসিক ট্রমা। কেউ কেউ এক সংঘাত থেকে আরেক সংঘাতে ঘুরে বেড়ান। এমনকি অপরাধচক্রের সদস্যদের যুদ্ধকৌশল শেখাতে বিদেশে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে, যা দেশে সহিংসতা বাড়াতে পারে।
কূটনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক উদ্বেগ
বিদেশে গুরুতর অপরাধে কলম্বীয় নাগরিকদের সম্পৃক্ততা সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। বিভিন্ন সংঘাতে অংশগ্রহণ, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ কিংবা শিশুসৈনিক প্রশিক্ষণের মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক সমালোচনা ডেকে এনেছে। সরকার আন্তর্জাতিক ভাড়াটে যোদ্ধাবিরোধী চুক্তিতে যুক্ত হলেও বাস্তবে এর প্রভাব সীমিত হতে পারে, কারণ বহু দেশই এ ধরনের চুক্তির বাইরে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রায়ই বেসরকারি নিরাপত্তা কাজের আড়ালে পরিচালিত হয়।
সমাধানের পথ কোথায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন, পুনঃপ্রশিক্ষণ ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হলে বিদেশি সংঘাতের আকর্ষণ কমবে না। অর্থ, কাজ এবং জীবনের উদ্দেশ্যের সন্ধান—এই তিন প্রলোভনই তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















