বিশ্ব গণমাধ্যমে যাঁর নাম একাই ঝড় তোলে, তিনি রুপার্ট মারডক। ফ্লিট স্ট্রিট থেকে আমেরিকার টেলিভিশন জগত—সবখানেই তাঁর প্রভাব ছিল প্রবল। কিন্তু এই ক্ষমতাবান সাম্রাজ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক জটিল, দ্বন্দ্বপূর্ণ পারিবারিক ইতিহাস। সাম্প্রতিক এক গ্রন্থে সেই শতবর্ষের কাহিনি উঠে এসেছে নতুন করে।
শৈশবের এক ঘটনা, যে শিক্ষা বদলে দিল জীবন
প্রায় নব্বই বছর আগে অস্ট্রেলিয়া থেকে ইউরোপগামী এক জাহাজে ছোট্ট রুপার্টকে সাঁতার শেখাতে তাঁর মা এলিজাবেথ মারডক হঠাৎ করে সুইমিং পুলে ফেলে দেন। পরে মারডক নিজেই বলেন, তিনি চিৎকার করতে করতে কোনোমতে ভেসে কিনারায় পৌঁছেছিলেন। এই কঠোর শিক্ষাই হয়তো তাঁকে জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে টিকে থাকার মানসিকতা গড়ে দেয়।
পারিবারিক উত্তরাধিকার ও প্রথম ক্ষমতার স্বাদ
মারডকের বাবা কিথ মারডক ব্রিটেনে সংবাদপত্র জগতে কাজ শুরু করেন এবং পরে অস্ট্রেলিয়ায় একটি শক্তিশালী সংবাদপত্র চেইন গড়ে তোলেন। ছোটবেলায় রুপার্ট রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। কিন্তু বাবার অকালমৃত্যুর পর ঋণ শোধ করতে গিয়ে পরিবারের অনেক সম্পদ বিক্রি হয়ে যায়। সেখান থেকেই শুরু হয় রুপার্ট মারডকের নতুন করে সাম্রাজ্য গড়ার অভিযান।
অস্ট্রেলিয়া থেকে ব্রিটেন, তারপর আমেরিকা
অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকা কিনে তিনি শক্ত ভিত গড়েন। ব্রিটেনে ‘দ্য সান’ দিয়ে যাত্রা শুরু করে পরে ঐতিহ্যবাহী ‘দ্য টাইমস’ অধিগ্রহণ করে আলোড়ন তোলেন। আমেরিকায় তিনি বিশ শতকের বিখ্যাত চলচ্চিত্র স্টুডিও অধিগ্রহণ করেন এবং পরে তা বিপুল মূল্যে বিক্রি করেন। বর্তমানে তাঁর সংবাদপত্র ও টেলিভিশন সম্পদের সম্মিলিত মূল্য কয়েক হাজার কোটি ডলার।

ফক্স নিউজের প্রভাব ও সম্পাদকীয় কৌশল
ফক্স নিউজসহ তাঁর গণমাধ্যমগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, গভীর রাতেও নির্দেশ দেওয়া—সব মিলিয়ে এক কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কথা উঠে এসেছে। অনেকে বলেন, প্রকাশ্যে নির্দেশ না দিলেও তাঁর মনোভাব বুঝে কাজ করাই ছিল প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি।
রাজনীতির সঙ্গে লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক
তরুণ বয়সে বামপন্থী ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সময়ের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছে। ব্রিটেন ও আমেরিকার বিভিন্ন নেতাকে কখনো সমর্থন, কখনো সমালোচনা করেছেন। তাঁর কাছে ক্ষমতা ছিল অনেকটাই লেনদেনের বিষয়। চীনে প্রবেশের জন্য সংবাদ পরিবেশনে ছাড় দেওয়া কিংবা সমালোচনামূলক বই প্রকাশ বন্ধ করার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
বিতর্ক, কেলেঙ্কারি ও আত্মপক্ষসমর্থন
ফোনে আড়িপাতা কেলেঙ্কারির জেরে একটি জনপ্রিয় পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। আবার ভুয়া দলিল প্রকাশের ঘটনায় তিনি একে বিনোদন ব্যবসার অংশ বলে উড়িয়ে দেন। সমালোচকেরা বলেন, অভিজাত-বিরোধী অবস্থান অনেক সময় তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিতর্ক ঢাকতে ব্যবহৃত হয়েছে।
উত্তরাধিকার নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরাধিকার প্রশ্নটি সামনে আসে। পরিবারের দ্বন্দ্ব নিয়ে নাটক ও উপন্যাস তৈরি হয়েছে। অবশেষে তিনি বড় ছেলে লাচলানকে উত্তরসূরি করার সিদ্ধান্ত নেন, যা অন্য সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছে। তবুও তিনি এখনো নিয়মিত কার্যালয়ে উপস্থিত থাকেন এবং অবসর নেওয়ার ইচ্ছা নেই বলে জানিয়েছেন।
গণমাধ্যম সাম্রাজ্যের যুগের অবসান?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মারডকের গল্প এক যুগের সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়। এখন সংবাদমাধ্যমের মালিকানায় বড় করপোরেট সংস্থার প্রভাব বাড়ছে, আর সামাজিক মাধ্যমে অ্যালগরিদম নির্ধারণ করছে খবরের ধারা। সংবাদপত্র অনেক ক্ষেত্রেই আর্থিকভাবে দুর্বল। এই প্রেক্ষাপটে মারডককে শেষ বড় সংবাদ সম্রাট বলেই মনে করছেন অনেকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















