০২:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
চীনের সামনে এখন সাম্রাজ্যের সেই পুরোনো ফাঁদ দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে? বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শিথিলতা: বাণিজ্য অর্থায়নে বাড়ল ঋণসীমা কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন ভি ডি সতীশন, ১৮ মে শপথের সম্ভাবনা পাকিস্তানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাতাহ-৪’ সফল পরীক্ষা, পাল্লা ও নিখুঁত আঘাতের সক্ষমতার দাবি বেইজিং বৈঠকে ইরান ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধে ব্রিকসের জোরালো অবস্থান চাইল তেহরান মিয়ানমার নিয়ে বর্ণনার লড়াই: রাষ্ট্র, বৈধতা ও সংবাদমাধ্যমের দায় এল নিনোর শঙ্কায় ফের গম কেনায় ঝুঁকছে এশিয়া, বাড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা চীনের সস্তা চিপের চাপে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর স্বপ্ন, টাটার নতুন ফ্যাবের সামনে কঠিন লড়াই

শিশু ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই: ঘোটকির আশফাক থেকে জাতীয় অঙ্গীকারে নতুন আশার আলো

সিন্ধুর ঘোটকি জেলার ছোট্ট গ্রাম থেকে করাচি পর্যন্ত পথটা প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েই দশ বছরের আশফাক এসেছিল চিকিৎসার আশায়। তখন সে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু টানা অসুস্থতায় তার শৈশব যেন থমকে গিয়েছিল বিছানার এক কোণে। জ্বর, তীব্র রক্তশূন্যতা আর হাড়ভাঙা ব্যথায় হাঁটতেও পারছিল না সে। পরিবারের কাছে বিষয়টি ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো।

২০২৩ সালের জুনে তাকে করাচির জাতীয় শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আনা হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে রক্তের মারাত্মক ক্যানসার তীব্র লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া। দীর্ঘ ১০ সপ্তাহ ধরে নীরবে এই রোগ শরীরকে গ্রাস করছিল।

এক শিশুর গল্প, হাজারো বাস্তবতা

আশফাকের গল্প আলাদা কিছু নয়। প্রতিবছর দেশে প্রায় ১০ হাজার শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। কিন্তু অর্ধেকেরও কম শিশু সঠিক চিকিৎসা পায়। উন্নত দেশে যেখানে শিশু ক্যানসারের বেঁচে থাকার হার ৮০ শতাংশের বেশি, সেখানে আমাদের মতো দেশে তা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্যে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় চার লাখ শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় লিউকেমিয়া, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৩০ শতাংশ। আধুনিক চিকিৎসায় এই রোগ অনেক ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য হলেও চিকিৎসা সুবিধা ও সচেতনতার অভাবে অসংখ্য শিশু বঞ্চিত হচ্ছে।

দেশে বর্তমানে মাত্র আটটি শিশু ক্যানসার বিভাগ রয়েছে। ক্যানসার নিবন্ধন ব্যবস্থাও সীমিত। তবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে জাতীয় শিশু ক্যানসার নিবন্ধন কর্মসূচি চালু হয়েছে, যা সঠিক তথ্য সংরক্ষণ ও চিকিৎসা উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

HEALTH: THE FIGHT AGAINST CHILDHOOD CANCER - Newspaper - DAWN.COM

বাঁচার লড়াই

আশফাককে হাসপাতালে ভর্তি করার পর দ্রুত রক্ত পরীক্ষা, অস্থিমজ্জা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু হয়। পরিবার প্রথমে মানতে পারেনি যে একটি শিশুর ক্যানসার হতে পারে। চিকিৎসকেরা দীর্ঘ সময় ধরে কাউন্সেলিং করেন। করাচিতে থেকে দীর্ঘমেয়াদি কেমোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

অর্থাভাবে পরিবার প্রথমে রাজি হয়নি। কৃষিশ্রমিক বাবা ইতোমধ্যেই যাতায়াতে সব সঞ্চয় শেষ করেছেন। কিন্তু চিকিৎসকদের আশ্বাস ও সামাজিক সহায়তায় তারা থেকে যান। পুরো চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। প্রায় ১০ লাখ রুপির সমপরিমাণ ব্যয় হতো, যা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

দীর্ঘ কেমোথেরাপির পর আশফাক এখন সম্পূর্ণ সুস্থতার পথে। সে আবার স্কুলে যাচ্ছে, ভাইবোনদের সঙ্গে খেলছে।

HEALTH: THE FIGHT AGAINST CHILDHOOD CANCER - Newspaper - DAWN.COM

ব্যবধান কমানোর চ্যালেঞ্জ

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে শিশু ক্যানসার চিকিৎসার বড় সমস্যা হলো দেরিতে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আর্থিক অক্ষমতা। অনেক পরিবার চিকিৎসা শুরুই করতে পারে না। আবার অনেকে মাঝপথে থেমে যায়।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সেন্ট জুড শিশু গবেষণা হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে গঠিত বৈশ্বিক শিশু ক্যানসার ওষুধ প্রাপ্তি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছে। লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বেঁচে থাকার হার ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশে নেওয়া।

সরকারি অঙ্গীকার, বিশেষজ্ঞদের উদ্যোগ ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে হাজারো শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

আজ আশফাকের হাসি প্রমাণ করে, সময়মতো চিকিৎসা পেলে শিশু ক্যানসার আর মৃত্যুদণ্ড নয়। প্রশ্ন শুধু একটাই, আমরা কি সময়মতো পৌঁছাতে পারব সেইসব শিশুর কাছে, যারা এখনো চিকিৎসার বাইরে রয়ে গেছে?

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের সামনে এখন সাম্রাজ্যের সেই পুরোনো ফাঁদ

শিশু ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই: ঘোটকির আশফাক থেকে জাতীয় অঙ্গীকারে নতুন আশার আলো

০৩:২০:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সিন্ধুর ঘোটকি জেলার ছোট্ট গ্রাম থেকে করাচি পর্যন্ত পথটা প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েই দশ বছরের আশফাক এসেছিল চিকিৎসার আশায়। তখন সে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু টানা অসুস্থতায় তার শৈশব যেন থমকে গিয়েছিল বিছানার এক কোণে। জ্বর, তীব্র রক্তশূন্যতা আর হাড়ভাঙা ব্যথায় হাঁটতেও পারছিল না সে। পরিবারের কাছে বিষয়টি ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো।

২০২৩ সালের জুনে তাকে করাচির জাতীয় শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আনা হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে রক্তের মারাত্মক ক্যানসার তীব্র লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া। দীর্ঘ ১০ সপ্তাহ ধরে নীরবে এই রোগ শরীরকে গ্রাস করছিল।

এক শিশুর গল্প, হাজারো বাস্তবতা

আশফাকের গল্প আলাদা কিছু নয়। প্রতিবছর দেশে প্রায় ১০ হাজার শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। কিন্তু অর্ধেকেরও কম শিশু সঠিক চিকিৎসা পায়। উন্নত দেশে যেখানে শিশু ক্যানসারের বেঁচে থাকার হার ৮০ শতাংশের বেশি, সেখানে আমাদের মতো দেশে তা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্যে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় চার লাখ শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় লিউকেমিয়া, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৩০ শতাংশ। আধুনিক চিকিৎসায় এই রোগ অনেক ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য হলেও চিকিৎসা সুবিধা ও সচেতনতার অভাবে অসংখ্য শিশু বঞ্চিত হচ্ছে।

দেশে বর্তমানে মাত্র আটটি শিশু ক্যানসার বিভাগ রয়েছে। ক্যানসার নিবন্ধন ব্যবস্থাও সীমিত। তবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে জাতীয় শিশু ক্যানসার নিবন্ধন কর্মসূচি চালু হয়েছে, যা সঠিক তথ্য সংরক্ষণ ও চিকিৎসা উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

HEALTH: THE FIGHT AGAINST CHILDHOOD CANCER - Newspaper - DAWN.COM

বাঁচার লড়াই

আশফাককে হাসপাতালে ভর্তি করার পর দ্রুত রক্ত পরীক্ষা, অস্থিমজ্জা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু হয়। পরিবার প্রথমে মানতে পারেনি যে একটি শিশুর ক্যানসার হতে পারে। চিকিৎসকেরা দীর্ঘ সময় ধরে কাউন্সেলিং করেন। করাচিতে থেকে দীর্ঘমেয়াদি কেমোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

অর্থাভাবে পরিবার প্রথমে রাজি হয়নি। কৃষিশ্রমিক বাবা ইতোমধ্যেই যাতায়াতে সব সঞ্চয় শেষ করেছেন। কিন্তু চিকিৎসকদের আশ্বাস ও সামাজিক সহায়তায় তারা থেকে যান। পুরো চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। প্রায় ১০ লাখ রুপির সমপরিমাণ ব্যয় হতো, যা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

দীর্ঘ কেমোথেরাপির পর আশফাক এখন সম্পূর্ণ সুস্থতার পথে। সে আবার স্কুলে যাচ্ছে, ভাইবোনদের সঙ্গে খেলছে।

HEALTH: THE FIGHT AGAINST CHILDHOOD CANCER - Newspaper - DAWN.COM

ব্যবধান কমানোর চ্যালেঞ্জ

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে শিশু ক্যানসার চিকিৎসার বড় সমস্যা হলো দেরিতে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আর্থিক অক্ষমতা। অনেক পরিবার চিকিৎসা শুরুই করতে পারে না। আবার অনেকে মাঝপথে থেমে যায়।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সেন্ট জুড শিশু গবেষণা হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে গঠিত বৈশ্বিক শিশু ক্যানসার ওষুধ প্রাপ্তি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছে। লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বেঁচে থাকার হার ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশে নেওয়া।

সরকারি অঙ্গীকার, বিশেষজ্ঞদের উদ্যোগ ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে হাজারো শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

আজ আশফাকের হাসি প্রমাণ করে, সময়মতো চিকিৎসা পেলে শিশু ক্যানসার আর মৃত্যুদণ্ড নয়। প্রশ্ন শুধু একটাই, আমরা কি সময়মতো পৌঁছাতে পারব সেইসব শিশুর কাছে, যারা এখনো চিকিৎসার বাইরে রয়ে গেছে?