যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের অবক্ষয় মানেই কেবল নির্বাচন কারচুপি বা সহিংস দমননীতি—এমন ধারণা এখন আর পুরো সত্য নয়। আরও নীরব কিন্তু গভীর সংকেত হলো জনসাধারণের অর্থ সুরক্ষার আইনি কাঠামো ভেঙে পড়া। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, হোয়াইট হাউস কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে, যার বড় অংশই আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থাকছে।
গণতন্ত্রে আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ভাঙন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতাসীনরা আইনসভাকে পাশ কাটিয়ে কর আর ব্যয়ের ক্ষমতা নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছে। কোথাও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তহবিল দিয়ে বড় যোগাযোগমাধ্যম চালানো হচ্ছে, কোথাও কর আইনের অপপ্রয়োগে বিরোধীদের চাপে রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও কর সুবিধার বিনিময়ে শাসক দলের তহবিল ভরছে করপোরেট প্রতিষ্ঠান। এর ফলে আইনসভার আর্থিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং নির্বাহী ক্ষমতা কার্যত অবারিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও একই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কর আরোপ ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের একচ্ছত্র ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই কাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ভেনেজুয়েলা, শুল্ক আর জরুরি ক্ষমতা
ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে অভিযানের মাধ্যমে প্রায় পাঁচশ মিলিয়ন ডলারের তেল আয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়, যা প্রথমে কাতারের একটি ব্যাংকে জমা ছিল। এই অর্থ ভেনেজুয়েলার হলেও তা ব্যবহারের ওপর বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ দাবি করে প্রশাসন।

একই সঙ্গে জরুরি ক্ষমতা দেখিয়ে ব্যাপক হারে শুল্ক আরোপ করা হয়, যার মাধ্যমে প্রায় একশ বত্রিশ বিলিয়ন ডলার তোলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, তা আইন দ্বারা নির্ধারিত হওয়ার কথা থাকলেও কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই তা ব্যবহারের ক্ষমতা দাবি করা হয়েছে।
বেসরকারি চুক্তি ও রপ্তানি শিথিলতা
বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক চুক্তির মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের জন্য বিপুল অর্থ আয়ের পথ তৈরি হয়েছে। একটি চুক্তিতে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ চীনে বিক্রির ক্ষেত্রে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিলের বিনিময়ে আয়ের একটি অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদিও ফেডারেল রপ্তানি আইন অনুযায়ী এমন লাইসেন্স ফি নিষিদ্ধ, তবুও সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
ফলে এই অর্থ কার্যত আইনসভার নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
রাজস্ব আদায় কাঠামোর দুর্বলতা
সরকারি রাজস্ব আদায়ের প্রধান সংস্থার কর্মীসংখ্যা গত এক বছরে প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমানো হয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই সরে গেছেন বা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কর আদায়ে শিথিলতা তৈরি হয়েছে এবং শত শত বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে সরকার জনসাধারণের করনির্ভরতা থেকে দূরে সরে যায় এবং নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ও অঙ্গরাজ্যে চাপ
প্রশাসন ইতিমধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কর সুবিধা বাতিলের হুমকি দিয়েছে। সমালোচনা এড়াতে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের অগ্রাধিকার মেনে চলতে বাধ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল অর্থায়ন স্থগিত করার ঘটনায় বন্ডবাজারেও প্রভাব পড়েছে। সুদের হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলো।

সাংবিধানিক ভারসাম্যের সংকট
সরকারি জবাবদিহি দপ্তর একাধিক ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্থ আটকে রাখার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার পথ সীমিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে নির্বাহী শাখা আরও বেশি আর্থিক ক্ষমতা নিজের হাতে নিচ্ছে।
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রশ্ন উঠছে, আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনী ফল প্রভাবিত করার আশঙ্কা কতটা বাস্তব।
কংগ্রেসের করণীয় কী
সংবিধান প্রণেতারা কর আর ব্যয়ের ক্ষমতা আইনসভার হাতে দেওয়ার মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি কমাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কংগ্রেস কার্যকর তদারকির ভূমিকা পালন করছে না—এমন সমালোচনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিশংসন ছাড়াও কংগ্রেসের হাতে বিকল্প পথ রয়েছে। বাজেট অনুমোদন আটকে দেওয়া, গোপন তহবিল চিহ্নিত করতে তদন্ত জোরদার করা এবং আইন লঙ্ঘনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া—এসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী বাজেট প্রক্রিয়া গড়ে তোলা এবং আইনসভা ও প্রশাসনের মধ্যে ভারসাম্য পুনর্গঠনই হতে পারে গণতন্ত্র রক্ষার প্রধান শর্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















