০৫:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রে ধাক্কা, ইউক্রেনের পাল্টা আঘাতে বদলাচ্ছে যুদ্ধের চিত্র হাঙ্গেরিতে নতুন যুগের শুরু, আইনের শাসন ফেরানোর প্রতিশ্রুতি পিটার মাজারের শাকিরা ও বার্না বয়ের “Dai Dai” — ২০২৬ FIFA বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং BTS ‘Arirang World Tour’ শুরু হলো আজ — সাত বছরের অপেক্ষা শেষ রাশিয়া-ইউক্রেন ১,০০০-র বিনিময়ে ২০৫ জন বন্দীকে মুক্তি দিল UAE-র মধ্যস্থতায় ট্রাম্প-শি সামিটে ইরান ও হরমুজে কোনো চুক্তি হলো না — বড় হতাশা নাকবা দিবস: ৭৮ বছরেও ফিলিস্তিনিদের “ফিরে যাওয়ার অধিকার” অপূর্ণ — বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ কিয়েভে রাশিয়ার ক্রুজ মিসাইল: ৯ তলা ভবন ধ্বংস, ২৪ নিহত — তিন কিশোরও হরমুজে নতুন উত্তেজনা: UAE-র কাছে জাহাজ আটক, ওমানে ভারতীয় জাহাজ ডুবল নাইজেরিয়ায় মার্কিন-নাইজেরিয়ান অভিযানে ISIS-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা নিহত

গিজেল পেলিকোর স্মৃতিকথা: এক নারীর লড়াই বদলে দিল ফ্রান্সের ধর্ষণ আইন

ফ্রান্সের এক বিভীষিকাময় ধর্ষণ মামলার কেন্দ্রীয় চরিত্র গিজেল পেলিকোর জীবনকাহিনি এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। তাঁর নতুন স্মৃতিকথা “এ হিম টু লাইফ” শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির গল্প নয়, বরং এটি আইন, সমাজ ও মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের এক শক্তিশালী দলিল হয়ে উঠেছে।

ঘটনার শুরু হয়েছিল স্বামী সম্পর্কে সাধারণ কিছু প্রশ্ন দিয়ে। প্রায় পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর গিজেল জানতে পারেন, তাঁর স্বামী ডোমিনিক দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে অচেতন করে ধর্ষণ করতেন এবং ইন্টারনেটে অপরিচিত পুরুষদেরও একই অপরাধে যুক্ত করতেন। হার্ডড্রাইভে “অ্যাবিউজ” নামে ফোল্ডারে এসব ঘটনার ভিডিও সংরক্ষণ করা ছিল।

দীর্ঘ নয় বছর ধরে চলা এই অপরাধ সামনে আসে পুলিশের তদন্তে। ২০২৪ সালে ডোমিনিকসহ আরও ৫০ জনকে ধর্ষণ ও হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আরও প্রায় ৩০ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

A Hymn to Life by Gisèle Pelicot review – a unique memoir by a figure of  astonishing power | Books | The Guardian

লজ্জার দায় বদলে দেওয়ার আহ্বান

মামলাটি গোপন রাখার অধিকার থাকা সত্ত্বেও গিজেল তা প্রকাশ্যে আনেন। তাঁর যুক্তি ছিল, লজ্জা ভুক্তভোগীর নয়, অপরাধীর হওয়া উচিত। এই অবস্থান বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া তোলে এবং ফ্রান্সে ধর্ষণের আইনি সংজ্ঞা বিস্তৃত করার পথে বড় ভূমিকা রাখে। নতুন আইনে জোর বা সহিংসতার পাশাপাশি সম্মতি ছাড়া সংঘটিত যৌন কর্মকেও ধর্ষণ হিসেবে ধরা হয়েছে।

এই সাহসিকতার জন্য গিজেল ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান লাভ করেন এবং বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান পান। অনেকের কাছে তিনি নারীবাদী সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা এক অনিচ্ছাকৃত নায়িকা

স্মৃতিকথায় গিজেল নিজেকে পরিকল্পিত নায়িকা হিসেবে নয়, বরং পরিস্থিতির চাপে সামনে আসা একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নারী মাত্র নয় বছর বয়সে মাকে হারান। জীবনের লক্ষ্য ছিল কেবল একটি স্বাভাবিক পরিবার গড়া।

তরুণ বয়সে ডোমিনিকের সঙ্গে পরিচয়, প্রেম এবং সংসার—সবই ছিল সাধারণ এক প্রেমের গল্প। কিন্তু অবসরের পর দক্ষিণ প্রোভঁসে চলে যাওয়ার পরই স্বামীর অপরাধ বেড়ে যায়। সন্তানদের থেকে দূরে একাকিত্বে থাকা অবস্থায় গিজেলের স্মৃতিভ্রংশ এত বেড়ে যায় যে তিনি নিজেই ভাবতে শুরু করেন, তাঁর হয়তো মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে।

Gisèle Pelicot: A Hymn to Life | Southbank Centre | Mark Ball

অবিশ্বাস, ভাঙন ও পরিবারের দূরত্ব

স্বামীর অপরাধ জানার পর গিজেলের জীবন ভেঙে পড়ে। অতীতের সুখস্মৃতিও তাঁর কাছে বিষাদে ভরে ওঠে। পরিবারের ভেতরেও তৈরি হয় দূরত্ব। তিন সন্তানের মধ্যে দুজনের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে পড়ে, কারণ তারা বাবার অপরাধ ভিন্নভাবে মেনে নেয়।

এই মামলার বড় তাৎপর্য ছিল—এটি প্রমাণ করে যৌন অপরাধী সবসময় অপরিচিত কেউ নয়, ঘরের ভেতরেও এমন ভয়াবহতা লুকিয়ে থাকতে পারে। বিচার শেষ হওয়ার পর ইউরোপের আরও কিছু দেশে অনুরূপ অভিযোগ সামনে আসে, যা বিষয়টির ব্যাপকতা তুলে ধরে।

সাধারণ মানুষের মুখোশের আড়ালে অপরাধ

গিজেলের ওপর নির্যাতনে জড়িত ব্যক্তিরা কেউই প্রভাবশালী বা বিখ্যাত ছিলেন না। তাদের মধ্যে ছিলেন দমকলকর্মী, নার্স, ট্রাকচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ, যাদের বেশিরভাগই কাছাকাছি এলাকায় বাস করতেন। আদালতে প্রতিদিন তাদের মুখোমুখি হওয়া ছিল গিজেলের জন্য আরেক মানসিক লড়াই।

তিনি লিখেছেন, তাদের সবার মধ্যে এক ধরনের অধিকারবোধ কাজ করত—যেন ক্ষমতা সবসময় তাদের পক্ষেই। আদালতে আইনজীবীদের কঠোর জেরা ও অভিযুক্তদের দৃষ্টিতে তাকিয়ে অনেক সময় তাঁকেই যেন কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মনে হতো।

A Hymn to Life' Review: Gisèle Pelicot's Memoir Is a Powerfully Written  Feminist Manifesto - The New York Times

বেদনা পেরিয়ে নতুন জীবনের বার্তা

২২টি ভাষায় প্রকাশিত এই স্মৃতিকথা এমন সময়ে এসেছে, যখন নারীদের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নিয়ে লেখা বই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পাঠক টানছে। গিজেলের বই বৈবাহিক বিশ্বাসঘাতকতা ও যৌন নির্যাতনের দুই অভিজ্ঞতাকেই একসঙ্গে তুলে ধরেছে।

অন্ধকার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও বইটির শেষ সুর আশাবাদী। গিজেল দেখাতে চেয়েছেন, গভীর ট্রমা থেকেও মানুষ নতুন জীবন গড়তে পারে। তবে স্বামীর আচরণের পেছনের চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে তাঁর মনে এখনও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রে ধাক্কা, ইউক্রেনের পাল্টা আঘাতে বদলাচ্ছে যুদ্ধের চিত্র

গিজেল পেলিকোর স্মৃতিকথা: এক নারীর লড়াই বদলে দিল ফ্রান্সের ধর্ষণ আইন

০৩:৫৩:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ফ্রান্সের এক বিভীষিকাময় ধর্ষণ মামলার কেন্দ্রীয় চরিত্র গিজেল পেলিকোর জীবনকাহিনি এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। তাঁর নতুন স্মৃতিকথা “এ হিম টু লাইফ” শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির গল্প নয়, বরং এটি আইন, সমাজ ও মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের এক শক্তিশালী দলিল হয়ে উঠেছে।

ঘটনার শুরু হয়েছিল স্বামী সম্পর্কে সাধারণ কিছু প্রশ্ন দিয়ে। প্রায় পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর গিজেল জানতে পারেন, তাঁর স্বামী ডোমিনিক দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে অচেতন করে ধর্ষণ করতেন এবং ইন্টারনেটে অপরিচিত পুরুষদেরও একই অপরাধে যুক্ত করতেন। হার্ডড্রাইভে “অ্যাবিউজ” নামে ফোল্ডারে এসব ঘটনার ভিডিও সংরক্ষণ করা ছিল।

দীর্ঘ নয় বছর ধরে চলা এই অপরাধ সামনে আসে পুলিশের তদন্তে। ২০২৪ সালে ডোমিনিকসহ আরও ৫০ জনকে ধর্ষণ ও হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আরও প্রায় ৩০ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

A Hymn to Life by Gisèle Pelicot review – a unique memoir by a figure of  astonishing power | Books | The Guardian

লজ্জার দায় বদলে দেওয়ার আহ্বান

মামলাটি গোপন রাখার অধিকার থাকা সত্ত্বেও গিজেল তা প্রকাশ্যে আনেন। তাঁর যুক্তি ছিল, লজ্জা ভুক্তভোগীর নয়, অপরাধীর হওয়া উচিত। এই অবস্থান বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া তোলে এবং ফ্রান্সে ধর্ষণের আইনি সংজ্ঞা বিস্তৃত করার পথে বড় ভূমিকা রাখে। নতুন আইনে জোর বা সহিংসতার পাশাপাশি সম্মতি ছাড়া সংঘটিত যৌন কর্মকেও ধর্ষণ হিসেবে ধরা হয়েছে।

এই সাহসিকতার জন্য গিজেল ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান লাভ করেন এবং বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান পান। অনেকের কাছে তিনি নারীবাদী সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা এক অনিচ্ছাকৃত নায়িকা

স্মৃতিকথায় গিজেল নিজেকে পরিকল্পিত নায়িকা হিসেবে নয়, বরং পরিস্থিতির চাপে সামনে আসা একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নারী মাত্র নয় বছর বয়সে মাকে হারান। জীবনের লক্ষ্য ছিল কেবল একটি স্বাভাবিক পরিবার গড়া।

তরুণ বয়সে ডোমিনিকের সঙ্গে পরিচয়, প্রেম এবং সংসার—সবই ছিল সাধারণ এক প্রেমের গল্প। কিন্তু অবসরের পর দক্ষিণ প্রোভঁসে চলে যাওয়ার পরই স্বামীর অপরাধ বেড়ে যায়। সন্তানদের থেকে দূরে একাকিত্বে থাকা অবস্থায় গিজেলের স্মৃতিভ্রংশ এত বেড়ে যায় যে তিনি নিজেই ভাবতে শুরু করেন, তাঁর হয়তো মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে।

Gisèle Pelicot: A Hymn to Life | Southbank Centre | Mark Ball

অবিশ্বাস, ভাঙন ও পরিবারের দূরত্ব

স্বামীর অপরাধ জানার পর গিজেলের জীবন ভেঙে পড়ে। অতীতের সুখস্মৃতিও তাঁর কাছে বিষাদে ভরে ওঠে। পরিবারের ভেতরেও তৈরি হয় দূরত্ব। তিন সন্তানের মধ্যে দুজনের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে পড়ে, কারণ তারা বাবার অপরাধ ভিন্নভাবে মেনে নেয়।

এই মামলার বড় তাৎপর্য ছিল—এটি প্রমাণ করে যৌন অপরাধী সবসময় অপরিচিত কেউ নয়, ঘরের ভেতরেও এমন ভয়াবহতা লুকিয়ে থাকতে পারে। বিচার শেষ হওয়ার পর ইউরোপের আরও কিছু দেশে অনুরূপ অভিযোগ সামনে আসে, যা বিষয়টির ব্যাপকতা তুলে ধরে।

সাধারণ মানুষের মুখোশের আড়ালে অপরাধ

গিজেলের ওপর নির্যাতনে জড়িত ব্যক্তিরা কেউই প্রভাবশালী বা বিখ্যাত ছিলেন না। তাদের মধ্যে ছিলেন দমকলকর্মী, নার্স, ট্রাকচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ, যাদের বেশিরভাগই কাছাকাছি এলাকায় বাস করতেন। আদালতে প্রতিদিন তাদের মুখোমুখি হওয়া ছিল গিজেলের জন্য আরেক মানসিক লড়াই।

তিনি লিখেছেন, তাদের সবার মধ্যে এক ধরনের অধিকারবোধ কাজ করত—যেন ক্ষমতা সবসময় তাদের পক্ষেই। আদালতে আইনজীবীদের কঠোর জেরা ও অভিযুক্তদের দৃষ্টিতে তাকিয়ে অনেক সময় তাঁকেই যেন কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মনে হতো।

A Hymn to Life' Review: Gisèle Pelicot's Memoir Is a Powerfully Written  Feminist Manifesto - The New York Times

বেদনা পেরিয়ে নতুন জীবনের বার্তা

২২টি ভাষায় প্রকাশিত এই স্মৃতিকথা এমন সময়ে এসেছে, যখন নারীদের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নিয়ে লেখা বই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পাঠক টানছে। গিজেলের বই বৈবাহিক বিশ্বাসঘাতকতা ও যৌন নির্যাতনের দুই অভিজ্ঞতাকেই একসঙ্গে তুলে ধরেছে।

অন্ধকার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও বইটির শেষ সুর আশাবাদী। গিজেল দেখাতে চেয়েছেন, গভীর ট্রমা থেকেও মানুষ নতুন জীবন গড়তে পারে। তবে স্বামীর আচরণের পেছনের চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে তাঁর মনে এখনও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।