ঠাকুরগাঁওয়ে চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে ফলনের হাসি থাকলেও বাজারে দামের ধসে সেই আনন্দ এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, ন্যূনতম দামেও আলু বিক্রি করতে পারছেন না কৃষকেরা। অনেক এলাকায় ৬০ কেজির এক বস্তা আলু ২০০ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে না। সেই হিসাবে কেজিপ্রতি দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ টাকার সামান্য বেশি।
এ অবস্থায় আলু হিমাগারে রাখবেন, নাকি বাড়িতে মজুত করবেন—এই সিদ্ধান্ত নিয়েই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে চাষিদের।
মাঠে আলু, নেই ক্রেতা
সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকায় দেখা যায়, কৃষক মনসুর আলীর ১০ বিঘা জমির গ্রানুলা জাতের আলু তুলছেন শ্রমিকেরা। জমির পাশে বস্তাভর্তি আলু পড়ে থাকলেও পাইকারের দেখা নেই।
মনসুর আলী জানান, ১০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও উত্তোলন মিলিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সেই জমির আলু এখন ১০ হাজার টাকাও বিক্রি হচ্ছে না। উল্টো ব্যবসায়ীরা প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত কয়েক কেজি আলু দিতে বলছেন।

রোগে ফলন কম, দামে আরও ধস
একই এলাকার কৃষক নুরুল আলম বলেন, সময়মতো গাছ সুস্থ থাকলে আলুর ওজন হয় ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম। কিন্তু এবার পচন রোগে গাছ আগেই মরে গেছে। ফলে আলুর আকার ছোট হয়েছে। এসব আলু কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৪ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না।
রহিমানপুর এলাকার কৃষক আব্দুল কুদ্দুস জানান, এক বিঘায় ভালো ফলন হলে প্রায় ৫ হাজার কেজি আলু পাওয়া যায়। কিন্তু এবার রোগের কারণে ফলন কমে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার কেজিতে নেমেছে। উৎপাদন কম, দামও কম—দুই দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
বাজারে সরবরাহ বেশি, চাহিদা কম
কৃষকেরা জানান, গ্রানুলা কেজিপ্রতি ৩ টাকা, এস্টেরিক্স ৫ টাকা, সানসান ৬ টাকা ও কুমড়িকা ৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত মৌসুমেও লোকসান হয়েছে। এবারও একই পরিস্থিতি হলে অনেকে আলু চাষ বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তায় আছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে আলুর সরবরাহ অনেক বেশি হলেও চাহিদা তুলনামূলক কম। রমজান মাস ও সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে পাইকারি বাজারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বেশি দামে কিনে হিমাগারে সংরক্ষণ করলে পরে লোকসানের ঝুঁকি থাকায় তারা সতর্ক অবস্থানে আছেন।

হিমাগারে জায়গা সীমিত
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ মৌসুমে ২৮ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ টন। কিন্তু জেলায় ১৭টি হিমাগারে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৩২ টন আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, গতবার লোকসানের পর কম জমিতে চাষের পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেক কৃষক বেশি লাভের আশায় আবাদ বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য জেলাতেও আলু চাষ বাড়ায় বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, ফলে দাম কমেছে। কৃষকদের বিকল্প ফসল ও পরিকল্পিত উৎপাদনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যায়।
এখন প্রশ্ন একটাই—বাম্পার ফলন কি আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ? মাঠে আলুর পাহাড়, কিন্তু কৃষকের ঘরে দুশ্চিন্তার ছায়া আরও ঘন হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















