কালীঘাটে সন্ধ্যা নেমে আসছে। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি ছাড়া চারপাশে নীরবতা। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক যাত্রা। এখন প্রশ্ন—এটাই কি তাঁর পথচলার শেষ, নাকি জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্থানের শুরু?
১৯৭৫ সালের এক গরম এপ্রিল দুপুরে শুরু এই গল্প। তখনকার তরুণ কংগ্রেস ছাত্রনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি চলন্ত জিপের বোনেটে উঠে জয়প্রকাশ নারায়ণের বিরুদ্ধে এবং ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষে স্লোগান দেন। মাত্র ২০ বছর বয়সেই তাঁর তেজি রাজনৈতিক ভঙ্গি এবং ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি অগাধ আনুগত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কালীঘাটের এক সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম তাঁর। ১৭ বছর বয়সে বাবাকে হারান। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি যোগমায়া কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করেন এবং পরে আইন, শিক্ষা ও ইতিহাসে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।

সত্তরের দশকে কলকাতার ছাত্ররাজনীতি যখন বামপন্থী আদর্শে প্রভাবিত, তখন মমতা কংগ্রেসের প্রতি অনুগত থাকেন। ১৯৮৪ সালে যাদবপুর লোকসভা আসনে সিপিআই(এম)-এর প্রভাবশালী নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে তিনি রাজ্যজুড়ে আলোচনায় আসেন। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী সহানুভূতির ঢেউ এবং সাধারণ মানুষের সমর্থনে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হন। ২৯ বছর বয়সে তিনি ভারতের অন্যতম কনিষ্ঠ সাংসদ হন।
এরপর তাঁর রাজনৈতিক জীবন ওঠানামার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ১৯৯১ সালে দক্ষিণ কলকাতা থেকে জয়ী হয়ে তিনি পি ভি নরসিংহ রাওয়ের মন্ত্রিসভায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হন। কিন্তু ক্রীড়া উন্নয়নে উদ্যোগ না থাকায় প্রতিবাদ জানিয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই মন্ত্রিত্ব হারান।
কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হতাশ হয়ে ১৯৯৮ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। প্রথমদিকে এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন তাঁকে কৃষকপক্ষের নেত্রী হিসেবে তুলে ধরে। এই আন্দোলনই ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী করে।

ক্ষমতায় এসেও তাঁর রাজনৈতিক ভঙ্গি খুব একটা বদলায়নি। ‘মা, মাটি, মানুষ’ স্লোগান দিয়ে তিনি আবেগভিত্তিক রাজনীতিকে সামনে রাখেন। তবে ২০১৯ সালের পর থেকে বিজেপির উত্থান তাঁর শক্ত ঘাঁটিতে চাপ সৃষ্টি করে। ২০২১ সালে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও তিনি জয় ধরে রাখেন।
তবুও চ্যালেঞ্জ কমেনি। শিল্পায়নের অভাব, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর ভাবমূর্তিতে আঘাত হানে। ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে সংখ্যালঘু, নারী ও দরিদ্র ভোটারদের একটি অংশ হারানোও তাঁর জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।
কলকাতার চায়ের দোকানগুলোতে টিভির সামনে হতভম্ব মানুষের ভিড় যেন এই রাজনৈতিক ঝড়ের চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু এই হতাশার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে তাঁর শক্তি। প্রশ্ন এখন একটাই—১৯৮৪ সালের মতো আবার কি তিনি ফিরে আসবেন, নাকি ইতিহাসের পাতায় একটি অধ্যায় হয়েই থেকে যাবেন?

জয়ন্ত রায় চৌধুরী 



















