মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে সক্রিয় অন্যতম বৃহৎ সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) এবং এর রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকানের (ইউএলএ) প্রধান তুয়ান ম্রাত নাইং প্রথমবারের মতো একজন বিদেশি সাংবাদিককে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ২০২৬ সালের ২ মার্চ আরাকানের এক গোপন স্থানে এই সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়।
আরাকান আর্মির উত্থান ও প্রভাব
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রায় ১৭ বছরে আরাকান আর্মি এখন আরাকান অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এটি বর্তমানে মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী বিদ্রোহী শক্তিগুলোর একটি। আরাকান অঞ্চল বহু দশক ধরে রোহিঙ্গা সংকট ও সামরিক অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক নজরে রয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবন ও নেতৃত্বে আসার পথ
তুয়ান ম্রাত নাইং জানান, তিনি সিত্তে শহরের একটি আইন কলেজে পড়াশোনা করলেও তা শেষ করতে পারেননি। ছাত্রজীবনেই তিনি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে প্রথম সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করা শুরু করেন এবং বিভিন্ন আরাকানপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
২০০৬ সালে তিনি ভারতে যান এবং পরে মিয়ানমারের অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মির (কেআইএ) সহায়তায় প্রশিক্ষণ নিয়ে ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত বাহিনী গড়ে তোলেন।
সামরিক সাফল্যের কারণ
নিজেদের সাফল্যের মূল কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন জনগণের সমর্থন, সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ। বিশেষ করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশ্বাস পুনর্গঠনকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক
সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সামরিক সরকার শক্তির অবস্থান থেকে আলোচনা করতে চায়, কিন্তু আমরা সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না।” তিনি আরও বলেন, বাস্তবতার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনাই স্থায়ী সমাধান দিতে পারে।
বেসামরিক নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট
আরাকানে বিমান হামলার প্রসঙ্গে তিনি জানান, বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তবে চলমান হামলার কারণে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ নিয়ে অবস্থান
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে উভয় পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পক্ষে মত দেন, তবে সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর কার্যক্রম পরিস্থিতিকে জটিল করছে বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হলে উভয় দেশের সীমান্তবর্তী জনগণ উপকৃত হবে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভারত
ভারতকে তিনি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে তারা আগ্রহী। কালাদান প্রকল্পেও সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।
মানবাধিকার অভিযোগ ও জবাব
আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, অনেক অভিযোগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করা হয় এবং পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কিছু জরুরি ব্যবস্থা নিতে হয়।

মাদক সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ
মাদক পাচার প্রসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। তবে সামরিক শাসনের সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে বলে দাবি করেন।
স্বাস্থ্যসেবা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আরাকানে চিকিৎসক ও ওষুধের সংকট দূর করতে তারা কাজ করছেন বলে জানান তিনি। একটি মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
আগামী দুই বছরে আরাকানের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, মানুষের কষ্ট দ্রুত শেষ হোক এবং একটি স্থায়ী সমাধান আসুক—এটাই তার প্রত্যাশা।
রাজীব ভট্টাচার্য 

























