০২:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হলিউডের মোহ, লস অ্যাঞ্জেলেসের রোদ আর কুতুরের জাদুতে ডিওর ক্রুজ ২০২৭ মসলাদার গরুর মাংসের টাকো বাটি যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোন ব্যবহারের পথ খুলল চীন, বদলাল প্রতিরক্ষা আইন বাংলাদেশের লাওয়াছড়ায় বনে ছেড়ে দেওয়া ৯ ধীরলোরির ৭টিই মারা গেল ঘরে দুই শিশুর নিথর দেহ, পাশে বাবার মরদেহ—যশোরে হৃদয়বিদারক ঘটনা নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে দেশজুড়ে সব এফআইআর বাতিল সুপ্রিম কোর্টের বৃদ্ধার চোখে বিজয়ের দামি চশমা, মানবিকতায় মুগ্ধ তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর ভক্ত নেপালের ভয়াবহ বন্যায় জলবায়ু সংকটের দায় এড়াচ্ছে পশ্চিমা গণমাধ্যম? হারাল্ডের মৃত্যুর পর নরওয়েতে রাজতন্ত্রের সমর্থন বেড়ে ৭২ শতাংশ, নতুন রাজার শপথ গোপন তহবিলের নামে জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ নেই

ক্যারিবীয় দ্বীপে ক্ষোভের ঝড়: কলম্বিয়াকে ‘উপনিবেশকারী’ বলছে সান আন্দ্রেসের মানুষ

ক্যারিবীয় সাগরের বুকে ছোট্ট এক দ্বীপ, কিন্তু ক্ষোভ আর অস্থিরতার ঢেউ সেখানে দিন দিন বেড়েই চলেছে। কলম্বিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সান আন্দ্রেস দ্বীপ এখন শুধু পর্যটনের জন্যই নয়, রাজনৈতিক বিতর্ক আর পরিচয় সংকটের কারণেও আলোচনায়। অনেক বাসিন্দা সরাসরি কলম্বিয়াকে ‘উপনিবেশকারী’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন, আর কেউ কেউ স্বাধীনতার দাবিও তুলছেন।

পর্যটনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সংকট

প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক এখানে ভিড় করেন সাগরের সাত রঙের জল আর সাদা বালুর সৈকত উপভোগ করতে। কিন্তু এই ঝকঝকে ছবির আড়ালে জমে উঠছে নানা সমস্যা। দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে আবর্জনা জমে থাকছে, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে। একটি অতিরিক্ত ভিড়ের কারাগার থেকে সরাসরি সাগরে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকট ও অপরাধের বিস্তার

The Caribbean island that calls Colombia a coloniser

দ্বীপে বেকারত্বের হার প্রায় ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। কাজের অভাবে অনেকেই বাধ্য হয়ে মাদক পাচারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে জড়িয়ে পড়ছেন। এর ফলে দ্বীপে সহিংসতা ও অপরাধের মাত্রাও বেড়ে গেছে। স্থানীয়দের মতে, এই পরিস্থিতি তাদের জীবনযাত্রাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

পরিচয় হারানোর ভয়

দ্বীপের আদিবাসী আফ্রো-ক্যারিবীয় জনগোষ্ঠী, যাদের রাইজাল বলা হয়, তারা মনে করছেন তাদের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, মূল ভূখণ্ডের লোকজন এসে জমি দখল করছে এবং পরিবেশ ধ্বংস করছে। অনেকেই বলছেন, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা আশাবাদী নন।

একজন রাইজাল নেতা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তাদের মানুষের জন্য সামনে কোনো পরিষ্কার পথ নেই। কেউ কেউ আবার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকিয়ে ইংল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কথাও ভাবছেন, কারণ ১৭শ শতকে ইংরেজ পিউরিটানরাই প্রথম এই দ্বীপে বসতি গড়েছিলেন।

রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত

An Unusual Journey Deep into a Colombian Amazon Town

স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কলম্বিয়ার নৌবাহিনীর দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। জেলেদের অভিযোগ, তাদের মাছের ভাণ্ডার লুটে নেওয়া হচ্ছে এবং তারা নিজেদেরই সমুদ্রে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংস্কৃতি রক্ষায় কাজ করা কর্মীদের দাবি, তারা কার্যত দমন-পীড়নের মধ্যে বাস করছেন।

১৯৯১ সালে কলম্বিয়ার সংবিধানে রাইজালদের জাতিগত অধিকার স্বীকৃতি পেলেও বাস্তবে তার খুব একটা সুফল তারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। তাদের মতে, কাগজে-কলমে অধিকার থাকলেই হবে না, প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন প্রয়োজন।

স্বাধীনতার ভাবনা ও বাস্তবতা

এই পরিস্থিতিতে কিছু মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার চিন্তা জোরদার হচ্ছে। কেউ কেউ চান, দ্বীপটি কলম্বিয়া থেকে আলাদা হয়ে অন্য কোনো ক্যারিবীয় দেশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলুক। তবে বাস্তবতা হলো, দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ রাইজাল নন, ফলে এমন দাবির পক্ষে বড় ধরনের সমর্থন পাওয়া কঠিন।

The Caribbean island that calls Colombia a coloniser

বর্তমান সরকারের অবস্থান

কলম্বিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেশের ভেতর উপনিবেশিক প্রভাব দূর করার কথা বললেও সান আন্দ্রেসের পরিস্থিতি তার জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন রাইজাল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্ব দেওয়া। কিন্তু স্থানীয়দের মতে, এসব পদক্ষেপ তাদের মূল সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।

এই দ্বীপের গল্প শুধু একটি অঞ্চলের সংকট নয়, বরং এটি পরিচয়, অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের এক জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হলিউডের মোহ, লস অ্যাঞ্জেলেসের রোদ আর কুতুরের জাদুতে ডিওর ক্রুজ ২০২৭

ক্যারিবীয় দ্বীপে ক্ষোভের ঝড়: কলম্বিয়াকে ‘উপনিবেশকারী’ বলছে সান আন্দ্রেসের মানুষ

০২:০৪:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

ক্যারিবীয় সাগরের বুকে ছোট্ট এক দ্বীপ, কিন্তু ক্ষোভ আর অস্থিরতার ঢেউ সেখানে দিন দিন বেড়েই চলেছে। কলম্বিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সান আন্দ্রেস দ্বীপ এখন শুধু পর্যটনের জন্যই নয়, রাজনৈতিক বিতর্ক আর পরিচয় সংকটের কারণেও আলোচনায়। অনেক বাসিন্দা সরাসরি কলম্বিয়াকে ‘উপনিবেশকারী’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন, আর কেউ কেউ স্বাধীনতার দাবিও তুলছেন।

পর্যটনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সংকট

প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক এখানে ভিড় করেন সাগরের সাত রঙের জল আর সাদা বালুর সৈকত উপভোগ করতে। কিন্তু এই ঝকঝকে ছবির আড়ালে জমে উঠছে নানা সমস্যা। দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে আবর্জনা জমে থাকছে, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে। একটি অতিরিক্ত ভিড়ের কারাগার থেকে সরাসরি সাগরে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকট ও অপরাধের বিস্তার

The Caribbean island that calls Colombia a coloniser

দ্বীপে বেকারত্বের হার প্রায় ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। কাজের অভাবে অনেকেই বাধ্য হয়ে মাদক পাচারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে জড়িয়ে পড়ছেন। এর ফলে দ্বীপে সহিংসতা ও অপরাধের মাত্রাও বেড়ে গেছে। স্থানীয়দের মতে, এই পরিস্থিতি তাদের জীবনযাত্রাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

পরিচয় হারানোর ভয়

দ্বীপের আদিবাসী আফ্রো-ক্যারিবীয় জনগোষ্ঠী, যাদের রাইজাল বলা হয়, তারা মনে করছেন তাদের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, মূল ভূখণ্ডের লোকজন এসে জমি দখল করছে এবং পরিবেশ ধ্বংস করছে। অনেকেই বলছেন, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা আশাবাদী নন।

একজন রাইজাল নেতা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তাদের মানুষের জন্য সামনে কোনো পরিষ্কার পথ নেই। কেউ কেউ আবার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকিয়ে ইংল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কথাও ভাবছেন, কারণ ১৭শ শতকে ইংরেজ পিউরিটানরাই প্রথম এই দ্বীপে বসতি গড়েছিলেন।

রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত

An Unusual Journey Deep into a Colombian Amazon Town

স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কলম্বিয়ার নৌবাহিনীর দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। জেলেদের অভিযোগ, তাদের মাছের ভাণ্ডার লুটে নেওয়া হচ্ছে এবং তারা নিজেদেরই সমুদ্রে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংস্কৃতি রক্ষায় কাজ করা কর্মীদের দাবি, তারা কার্যত দমন-পীড়নের মধ্যে বাস করছেন।

১৯৯১ সালে কলম্বিয়ার সংবিধানে রাইজালদের জাতিগত অধিকার স্বীকৃতি পেলেও বাস্তবে তার খুব একটা সুফল তারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। তাদের মতে, কাগজে-কলমে অধিকার থাকলেই হবে না, প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন প্রয়োজন।

স্বাধীনতার ভাবনা ও বাস্তবতা

এই পরিস্থিতিতে কিছু মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার চিন্তা জোরদার হচ্ছে। কেউ কেউ চান, দ্বীপটি কলম্বিয়া থেকে আলাদা হয়ে অন্য কোনো ক্যারিবীয় দেশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলুক। তবে বাস্তবতা হলো, দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ রাইজাল নন, ফলে এমন দাবির পক্ষে বড় ধরনের সমর্থন পাওয়া কঠিন।

The Caribbean island that calls Colombia a coloniser

বর্তমান সরকারের অবস্থান

কলম্বিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেশের ভেতর উপনিবেশিক প্রভাব দূর করার কথা বললেও সান আন্দ্রেসের পরিস্থিতি তার জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন রাইজাল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্ব দেওয়া। কিন্তু স্থানীয়দের মতে, এসব পদক্ষেপ তাদের মূল সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।

এই দ্বীপের গল্প শুধু একটি অঞ্চলের সংকট নয়, বরং এটি পরিচয়, অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের এক জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।