ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব ইউক্রেন যুদ্ধের ওপরও পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত জয় পাবে, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হবে, নাকি তেহরানে কৌশলগত ব্যর্থতা ঘটবে—এই প্রতিটি সম্ভাবনারই কিয়েভের জন্য সামরিক ও রাজনৈতিক পরিণতি রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কৌশল
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কৌশল অনেকটা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগের অভিযানের মতো বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে প্রথমে দেশের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়—ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে অপহরণের মাধ্যমে এবং ইরানের ক্ষেত্রে সরাসরি হত্যার মাধ্যমে। এরপর নতুন নেতৃত্বকে চাপের মুখে এনে আত্মসমর্পণের মতো অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য থাকে, যাতে তারা আক্রমণকারীদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়।
তবে এই পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়নি বলে মনে হচ্ছে। ওয়াশিংটনের নানা ইঙ্গিত সত্ত্বেও ইরানের নতুন নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি।
প্রথম ধাক্কা সামলে নেওয়ার পর ইরান এখন সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে—বিশেষ করে আকাশ ও সমুদ্রপথে।

বাহ্যিক সমর্থনের প্রশ্ন
ইরানের জন্য শুধু অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি নয়, বাইরের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সমর্থন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা না থাকলেও পর্দার আড়ালে কিছু কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জানুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি মস্কো সফর করেন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করেন।
রাশিয়া সম্ভবত ইরানকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং গেরান ড্রোন সরবরাহ করতে পারে—যা কিছুটা ব্যঙ্গাত্মকও, কারণ এই ড্রোনের নকশা মূলত ইরানেই তৈরি। অন্যদিকে চীন চাইলে ইরানকে একটি প্রক্সি শক্তিতে পরিণত করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে বড় ধাক্কা দিতে পারে। তবে বেইজিং ও তেহরান এমন অংশীদারিত্বে কতটা আগ্রহী—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। এসব পরিস্থিতির প্রত্যেকটি ইউক্রেন যুদ্ধের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্রুত জয় লাভের সম্ভাবনা
প্রথম কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নির্ণায়ক আঘাত হানতে পারেনি। কিন্তু তাতে তেহরানের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল—এমনটাও বলা যায় না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের নতুন নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হতে পারে।
রাশিয়ার জন্য এটি অনুকূল ফল হবে না, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির দিক থেকে। পশ্চিমা প্রচারযন্ত্র ইতিমধ্যে একটি ধারাবাহিক বর্ণনা তৈরি করার চেষ্টা করছে—যেখানে বলা হচ্ছে, প্রথমে সিরিয়া, পরে ভেনেজুয়েলা এবং এখন ইরানের ওপর হামলা হয়েছে, আর রাশিয়া তার মিত্রদের রক্ষা করতে পারছে না।
বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। এই তালিকার মধ্যে সিরিয়াকেই রাশিয়ার প্রকৃত মিত্র হিসেবে ধরা যায়। আর সেখানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরও রাশিয়ার প্রভাব বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে। ভেনেজুয়েলা মূলত চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আর ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক সবসময়ই জটিল ছিল, যদিও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায় দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।
তবুও যদি ইরান পরাজিত হয়, তাহলে ইউক্রেনের মনোবল বাড়তে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এতে যুক্তরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে। তখন ওয়াশিংটন আরও বড় সামরিক চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী হতে পারে। সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে নয়, বরং তার কোনো সামরিক মিত্র—যেমন উত্তর কোরিয়া বা বেলারুশ—এর সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
এছাড়া ইরান সংকট দ্রুত শেষ হলে তেলের দাম কমে যেতে পারে, যা রাশিয়ার জন্য লাভজনক হবে না।

দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধ
আলি লারিজানির মতে, ইরান সামরিক ও বেসামরিক শাসনে বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ প্রতিটি সামরিক অঞ্চল বা এমনকি পৃথক ব্রিগেডও কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ইরানকে পরাজিত করতে হলে দেশের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে হবে।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রেরও সীমিত। প্রায় এক মাসের মধ্যে নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে এবং সেগুলো পুনরায় তৈরি করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ এই ব্যবস্থাগুলো বর্তমানে শুধু ইসরায়েলেই নয়, পারস্য উপসাগরের আরব দেশগুলোতেও সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কাজ করছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যেখানে ন্যাটো মিত্রদের সহায়তাও প্রয়োজন হতে পারে।
এই পরিস্থিতি রাশিয়ার পক্ষে যেতে পারে। দীর্ঘ যুদ্ধ হলে বিশ্বের মনোযোগ ইউক্রেন থেকে সরে যাবে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ—যেমন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—পারস্য উপসাগরে সরিয়ে নেওয়া হবে। এতে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ সংঘাত চললে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকবে, যা রাশিয়াকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় সরবরাহকারী হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

এক মাসের মধ্যে অচলাবস্থা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র তার সম্পদ প্রায় শেষ করে ফেলে কিন্তু ইরানে শাসন পরিবর্তন ঘটাতে না পারে, তাহলে ওয়াশিংটনকে সামরিক অভিযান কমিয়ে আনা এবং কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পথ খুঁজতে হতে পারে।
ইরানও এমন একটি সমঝোতায় আগ্রহী হতে পারে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিমান হামলা দেশের অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দীর্ঘ যুদ্ধ সরকারকেও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
এই ফলাফলকে অনেকেই অচলাবস্থা বলতে পারেন—যদিও ট্রাম্প সম্ভবত এটিকে বিজয় হিসেবেই ঘোষণা করবেন। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য একটি ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সম্প্রতি ট্রাম্প প্রকাশ্যে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার দাবি করেন এবং ইরানের নতুন নেতা হিসেবে কাকে নিয়োগ করবেন সে সম্পর্কেও কথা বলেন।
যদি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, তাহলে তা ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
রাশিয়ার জন্য এর ভিন্ন অর্থ থাকতে পারে। কয়েক বছর আগে মস্কো দেখিয়েছিল বাইডেন প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা কোথায়। এখন তেহরান দেখাতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনের সীমা কোথায়।

ইউক্রেনের জন্য এর তাৎপর্য
ইউক্রেন এখনো আশা ধরে রেখেছে যে সময়ের সঙ্গে রাশিয়া দুর্বল হয়ে পড়বে এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পিছিয়ে যাবেন। এই বিশ্বাস থেকেই তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে দেশের ভেতরে অসন্তোষও বাড়ছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যেকোনো মূল্যে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা কমে এসেছে। এখন এই অবস্থান মূলত প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ মহল এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর নির্দেশনা বাস্তবায়নকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

যদি ইরান যুদ্ধে অচলাবস্থা তৈরি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত ফল না পায়, তাহলে ইউক্রেনের আশা আরও বড় ধাক্কা খেতে পারে। তখন অনেকেই বুঝতে পারবে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সব পরিস্থিতিতে রক্ষা করতে পারবে না।
আরেকটি বড় প্রভাব হবে সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি। ইরান যুদ্ধ চলতে থাকলে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত দ্রুত কমে যাবে, যা ইউক্রেনের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
শেষ কথা
ইরানের জন্য সামনে আসছে সিদ্ধান্তমূলক সময়। প্রতিটি দিন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে প্রতিটি সফল হামলা পরিস্থিতিকে নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে।
যদি ওয়াশিংটন ইরানে শাসন পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, ইউক্রেনের জন্যও গুরুতর হবে—কারণ কিয়েভ তার ভবিষ্যতের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে রেখেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















