মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের ওপর সামরিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও জনমত গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে এ হামলা নিয়ে স্পষ্ট মতভেদ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কংগ্রেসের ভেতরেও রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলেই মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। তবে তেহরান বলছে, এ হামলা সম্পূর্ণ অপ্ররোচিত এবং এর জবাবে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাথমিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযান আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রাথমিক জনসমর্থন নিয়ে শুরু হয়েছে।

জনমতে কী প্রতিক্রিয়া
সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপে দেখা গেছে, ইরানে হামলার বিষয়ে মার্কিন জনমত বিভক্ত। হামলার প্রথম দিনেই পরিচালিত ইউগভ জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৩৪ শতাংশ আমেরিকান এ অভিযানের পক্ষে, আর ৪৪ শতাংশ এর বিরোধিতা করছেন। আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে বড় কোনো সামরিক অভিযানের শুরুতে এত কম সমর্থন আগে দেখা যায়নি।
তুলনামূলকভাবে, আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ৯২ শতাংশ এবং ইরাক যুদ্ধের শুরুতে ৭১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক সমর্থন জানিয়েছিলেন।
পরের দিন প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে সমর্থন আরও কমে যায়। সেখানে দেখা যায়, মাত্র ২৭ শতাংশ মানুষ ইরানে মার্কিন হামলাকে সমর্থন করছেন, আর ৪৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করছেন। জরিপে আরও উঠে আসে, ৫৬ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার অজুহাতে সামরিক শক্তি ব্যবহারে অতিরিক্ত আগ্রহী। এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও প্রতি চারজনের একজন এই মত দিয়েছেন।
অনেকেই বলেছেন, এ যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ঘটলে তাদের সমর্থনের অবস্থান বদলে যেতে পারে। ইতিমধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, অভিযানের শুরু থেকে কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত ও আহত হয়েছেন। প্রথমে তিনজন নিহত হওয়ার কথা জানানো হলেও পরে নিহতের সংখ্যা ছয়জন বলে হালনাগাদ করা হয়।
সিএনএনের একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫৯ শতাংশ আমেরিকান ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন। প্রায় ৬০ শতাংশের মতে, ট্রাম্পের স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই এবং ৬২ শতাংশ মনে করেন, পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া উচিত।

রিপাবলিকানদের অবস্থান
কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের মধ্যেও এ হামলা নিয়ে মতভেদ দেখা গেছে। কিছু সিনেটর ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে অশুভ শক্তির অবসান ঘটানোর সূচনা করেছে।
হাউস স্পিকার মাইক জনসন বলেছেন, ইরান তাদের কর্মকাণ্ডের কঠোর পরিণতি ভোগ করছে এবং হামলার আগে ট্রাম্প শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধানের সব পথই চেষ্টা করেছিলেন। সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির চেয়ারম্যান টম কটন এ অভিযানকে প্রতিশোধ, ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তার জন্য জরুরি মিশন বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে রিপাবলিকানদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। কেন্টাকির কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি বলেছেন, এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সিনেটর র্যান্ড পল বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়।
সাবেক কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেইলর গ্রিন অভিযোগ করেছেন, প্রশাসন তাদের ‘আর কোনো বিদেশি যুদ্ধ নয়’ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে, যা ম্যাগা আন্দোলনের সমর্থকদের হতাশ করেছে।

ডেমোক্র্যাটদের প্রতিক্রিয়া
ডেমোক্র্যাটদের বেশিরভাগই এ অভিযানকে অনুমোদনবিহীন ও অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সিনেটর অ্যাডাম শিফ বলেছেন, ট্রাম্প আমেরিকাকে এমন এক বিদেশি যুদ্ধে জড়াচ্ছেন যা জনগণ চায় না এবং কংগ্রেস অনুমোদন দেয়নি।
হাউস ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস একই মত প্রকাশ করেছেন। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এ হামলাকে অবৈধ, পরিকল্পিত এবং অসাংবিধানিক যুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।
সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এটিকে সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার সতর্ক করে বলেছেন, স্পষ্ট কোনো শেষ লক্ষ্য না থাকলে এটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম প্রশাসনের এই দাবি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল। সিনেটর টিম কেইন এ হামলাকে বিশাল ভুল বলে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা সীমিত করতে তিনি যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করবেন।
তবে কিছু ডেমোক্র্যাট তুলনামূলকভাবে সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। প্রতিনিধি গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান ও টম সুয়োজি বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরান বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। টেক্সাসের প্রতিনিধি হেনরি কুয়েলারও বলেছেন, ইরানের হুমকি দীর্ঘদিনের এবং বাস্তব। নিউ জার্সির প্রতিনিধি জশ গটহাইমার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও মিত্রদের রক্ষায় প্রশাসনের দৃঢ় পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কতটা প্রভাবিত
নতুন সামরিক সংঘাত শুরু হলে সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্টদের জনপ্রিয়তা বাড়ে। কিন্তু জরিপগুলো বলছে, ট্রাম্প সেই প্রচলিত সুবিধা পাননি।
বিভিন্ন জরিপ বিশ্লেষণ অনুযায়ী তার অনুমোদনের হার প্রায় ৩৯ থেকে ৪৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, আর বিরোধিতার হার ৫৪ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে সমর্থন প্রায় ৩২ শতাংশ।
ইপসোস জানিয়েছে, ইরানে হামলা ট্রাম্পের মূল সমর্থক গোষ্ঠীর বাইরে নতুন সমর্থন বাড়াতে পারেনি। তার সমর্থন প্রধানত রিপাবলিকানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যেখানে সমর্থনের হার প্রায় ৮০ থেকে ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা ব্যাপকভাবে এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে।
ট্রাম্প কী বলছেন
ইরানে হামলার বিষয়ে জনমত জরিপে কম সমর্থন দেখালেও ট্রাম্প তা গুরুত্ব দিতে রাজি নন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি জরিপ নিয়ে চিন্তা করি না। আমাকে সঠিক কাজটাই করতে হবে। এই পদক্ষেপ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
তিনি আরও বলেন, ইরানের মতো একটি দেশকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া যায় না। তার দাবি, প্রকৃত জরিপ করলে দেখা যাবে আমেরিকানরা এই পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন।
ট্রাম্পের মতে, অনেক মানুষ প্রকাশ্যে মত না দিলেও নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ তার পদক্ষেপে সন্তুষ্ট।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রভাব
মার্কিন গণমাধ্যমগুলো বলছে, এই সংঘাত ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের প্রাথমিক নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে টেক্সাসসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকানদের জন্য বিষয়টি জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল এবং দেশীয় ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিল।
এখন নতুন সামরিক অভিযানের ফলে সেই অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। সমালোচকদের মতে, প্রাথমিক নির্বাচনে প্রার্থীদের অবস্থান—কে ট্রাম্পের ইরান অভিযান সমর্থন করেছেন আর কে বিরোধিতা করেছেন—সেটিই বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















