বিশ্ব রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন এবং বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রক্ষায় চীন ও সিঙ্গাপুরের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বেইজিংয়ে নিযুক্ত সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রদূত পিটার তান হাই চুয়ান।
মঙ্গলবার বেইজিংয়ের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক ব্যবস্থার ওপর বাড়ছে চাপ
পিটার তান হাই চুয়ান বলেন, গত বছরের শুরু থেকেই বিশ্বে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, মুক্ত বাণিজ্য এবং উন্মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
তার মতে, ছোট দেশগুলোর জন্য স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর বড় দেশগুলোর প্রয়োজন পূর্বানুমানযোগ্য উন্নয়ন। তাই একটি উন্মুক্ত, সংযুক্ত এবং সহযোগিতামূলক আঞ্চলিক পরিবেশ সবার জন্যই উপকারী।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা চীন ও সিঙ্গাপুর উভয় দেশেরই অভিন্ন লক্ষ্য।

নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রশ্ন
যদিও পশ্চিমা অনেক দেশ চীনকে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার অভিযোগ করে থাকে, বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধারণাকে সমর্থন করেনি।
চীন বরাবরই বলে এসেছে, তারা জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে গঠিত বিশ্বব্যবস্থাকে সমর্থন করে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব
রাষ্ট্রদূত তান বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, সিঙ্গাপুর ও চীন একসঙ্গে একটি আরও সমন্বিত এবং সমৃদ্ধ এশিয়া গড়ে তুলতে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৩৫ বছর ধরে দুই দেশ একটি শক্তিশালী, অনন্য এবং গতিশীল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
এই সম্পর্ক কেবল সাংস্কৃতিক বা জাতিগত বন্ধনের ওপর নয়, বরং সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। সিঙ্গাপুরকে প্রায়ই এমন একটি দেশ হিসেবে দেখা হয় যেখানে চীনের বাইরে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী চীনা বংশোদ্ভূত।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি
রাষ্ট্রদূত তান বলেন, প্রকৃত বন্ধুত্ব মানে একই রকম হওয়া নয়; বরং পার্থক্যকে সম্মান করা, আন্তরিক থাকা এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সিঙ্গাপুরের অবস্থান
বর্তমানে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং তার বৈদেশিক নীতির প্রভাব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানে সামরিক হামলার মতো ঘটনাগুলো।
এসব কারণে অনেক দেশই এখন এই দুই শক্তির মধ্যকার অবস্থান নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার অন্যতম প্রধান অংশীদার। অন্যদিকে পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
চীনা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে সিঙ্গাপুর চীনে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস।
তবে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সমদূরত্ব বজায় রাখার সিঙ্গাপুরের কৌশল সাম্প্রতিক সময়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থাকে রক্ষার আহ্বান
চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য প্রতিযোগিতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পিটার তান বলেন, বাণিজ্যনির্ভর দেশ হিসেবে সিঙ্গাপুর পরিস্থিতির দিকে খুবই নিবিড়ভাবে নজর রাখছে।
তিনি বলেন, উন্মুক্ত ও মুক্ত বাণিজ্যের বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি এবং সিঙ্গাপুর এ লক্ষ্যেই কাজ করে যাবে।

তার মতে, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বে যে জটিল পরিবর্তন ঘটছে, সেই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা ফোরামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক মুক্ত বাণিজ্য, উন্মুক্ততা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নিতে কাজ চালিয়ে যাবে।
চীন-সিঙ্গাপুর সহযোগিতার আহ্বান
একই অনুষ্ঠানে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট চায়না ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের উপ-সভাপতি লিউ ছিং বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই “জঙ্গলের আইন” বা শক্তিশালীর প্রাধান্যের ঝুঁকি বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চীন ও সিঙ্গাপুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতি এবং ছোট ছোট জোটের রাজনীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধি রক্ষায় যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















