লেবাননে ইরান-সমর্থিত সংগঠন হিজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে যুক্ত হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার জবাবে তারা ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা প্রধানকে হত্যা করে এবং লেবাননে সংগঠনটির ঘাঁটিগুলোতে বোমা হামলা চালায়। এমনকি ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অতিরিক্ত স্থল সেনা পাঠায় এবং প্রায় ৮০টি গ্রাম খালি করার নির্দেশ দেয়।
তবে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই ইসরায়েলের জন্য সহজ হবে না। লেবাননের সমাজ ও রাজনীতির গভীরে সংগঠনটির প্রভাব রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির দুর্বল সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক অস্থিরতা হিজবুল্লাহকে পরাজিত করা কঠিন করে তুলেছে। যুদ্ধের সময় সংগঠনটি নিহত নেতাদের জায়গায় নতুন নেতৃত্ব বসাচ্ছে এবং সামরিক কর্মকাণ্ডকে বিকেন্দ্রীকরণ করছে। তাদের কাছে এখনও রকেট, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, এবং অতীতের মতো বিদেশেও সন্ত্রাসী হামলা চালানোর সক্ষমতা থাকতে পারে।
ইসরায়েল গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াই করছে। কখনও সীমিত আক্রমণ, আবার কখনও ব্যাপক বোমা হামলা ও সীমিত স্থল অভিযান চালানো হয়েছে। তবুও নানা আঘাতের পরও সংগঠনটি টিকে আছে।

তবে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তা হিজবুল্লাহকে “সন্ত্রাসীদের এ-টিম” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এখন সেই শক্তিশালী অবস্থান আর নেই। ২০২৩ সালের পর থেকে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় সংগঠনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র আসাদ সরকারের পতনও তাদের বড় ধাক্কা দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান নিজেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে লেবাননের ভেতরেও হিজবুল্লাহর বিরোধীরা আগের চেয়ে বেশি সাহসী হয়ে উঠছে। রাজনৈতিকভাবে সংগঠনটি সম্ভবত প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
তবে এর মানে এই নয় যে হিজবুল্লাহ শেষ হয়ে গেছে। সংগঠনটি দুর্বল হলেও পুরোপুরি পরাজিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আঞ্চলিক অংশীদারদের উচিত ইরানের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে হিজবুল্লাহর ওপর আরও চাপ বাড়ানো। দীর্ঘমেয়াদি চাপ, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংগঠনটির ক্ষমতা স্থায়ীভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সেনাবাহিনী থেকে মিলিশিয়ায় রূপান্তর
হিজবুল্লাহর দুর্ভোগ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর, হামাসের ইসরায়েল হামলার পরদিন। দীর্ঘদিনের সংঘাতের ধারাবাহিকতায় কয়েক মাস ধরে সীমিত পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকে। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল বড় ধরনের আক্রমণ শুরু করে। পেজার ও ওয়াকি-টকিতে লুকানো বিস্ফোরক বিস্ফোরণের মাধ্যমে এক হাজারের বেশি হিজবুল্লাহ সদস্যকে হত্যা বা আহত করা হয়। এরপর সংগঠনটির সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয় এবং দীর্ঘদিনের নেতা হাসান নাসরাল্লাহসহ অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। পরে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযানও চালায়।
এই আঘাতে হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি ও রকেটভান্ডার প্রত্যাশামতো কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় এবং লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে নিজেদের বাহিনী সরিয়ে নেয়। সেখানে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

নাসরাল্লাহর উত্তরসূরি নাঈম কাসেম স্বীকার করেন, যুদ্ধে তাদের ১৮ হাজার সদস্য হতাহত হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ হাজার নিহত। ইসরায়েলের দাবি, তারা হিজবুল্লাহর প্রায় ৮০ শতাংশ রকেট ধ্বংস করেছে। এছাড়া নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। কাসেম নাসরাল্লাহর মতো প্রভাবশালী নন। লেবানন বিশ্লেষক হানিন ঘাদ্দারের ভাষায়, হিজবুল্লাহ এখন “একটি সেনাবাহিনী থেকে মিলিশিয়ায় পরিণত হয়েছে।” তবুও যুদ্ধের পর সংগঠনটির কাছে এখনও প্রায় ২৫ হাজার রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪০ থেকে ৫০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল লেবাননের ভেতরে পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি রেখে দেয় এবং নিয়মিত হামলা চালাতে থাকে। হিজবুল্লাহ এটিকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করলেও তারা তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। কারণ প্রতিরোধ করলে আরও কঠোর প্রতিশোধের ঝুঁকি ছিল। কিন্তু এই নীরবতা তাদের সমর্থকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে, কারণ সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।
অর্থনৈতিক চাপও বেড়েছে। ২০২৪ সালে ইসরায়েল হিজবুল্লাহ-সংযুক্ত ব্যাংকের শাখাগুলোতে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে লেবানন সরকারও সংগঠনটির আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। একই সময়ে নতুন যোদ্ধা নিয়োগ, অস্ত্র সংগ্রহ এবং নিহত সদস্যদের পরিবারের খরচ বহন করতে গিয়ে তাদের ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে অনেক যোদ্ধা ও তাদের পরিবারের ভাতা কমিয়ে দিতে হয়েছে।
কমছে মিত্র, বাড়ছে শত্রু
বিদেশি সমর্থন কমে যাওয়ায় হিজবুল্লাহর সংকট আরও গভীর হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতন ঘটে এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, যারা হিজবুল্লাহর বিরোধী। সিরিয়ার নতুন শাসকরা এখন লেবাননে অস্ত্র পাচার বন্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং মাদক ব্যবসার ওপরও কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে, যা একসময় হিজবুল্লাহর আয়ের উৎস ছিল।

অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহর আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়।
ইরান এখনও তাত্ত্বিকভাবে হিজবুল্লাহকে সমর্থন করে, কিন্তু তারাও এখন চাপে রয়েছে। আগে ইরান বছরে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিত, যা সংগঠনটির বাজেটের বড় অংশ ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত আট বছরে দেশটির জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ৯০ শতাংশের বেশি কমেছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভও মূলত মুদ্রার পতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শুরু হয়েছিল।
ভবিষ্যতে ইরানের সরকার আর্থিক সংকট বা সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারণে হিজবুল্লাহকে সহায়তা কমিয়ে দিতে পারে।
এদিকে গোয়েন্দা নিরাপত্তা নিয়েও বড় সংকটে পড়েছে সংগঠনটি। পেজার বিস্ফোরণ ও ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ইসরায়েল দেখিয়েছে যে তারা হিজবুল্লাহর ভেতরে গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। এখন সংগঠনটির জন্য গুপ্তচর শনাক্ত করা ও যোগাযোগব্যবস্থা নিরাপদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে যখন তারা যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে।

লেবাননের ভেতরেও প্রতিদ্বন্দ্বীরা আরও সক্রিয় হয়েছে। লেবাননের সেনাবাহিনী দক্ষিণাঞ্চলে মোতায়েন হয়ে হিজবুল্লাহর অস্ত্র জব্দের চেষ্টা করছে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। এমনকি বৈরুত বিমানবন্দর এখন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, যেখানে আগে হিজবুল্লাহ অস্ত্র ও সরঞ্জাম আনা-নেওয়া করত।
২০২৪ সালের নভেম্বরে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন প্রকাশ্যে বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় বসা ছাড়া দেশের আর কোনো পথ নেই। এই মন্তব্য দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ভেঙে দেয়।
ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাত শুরু হওয়ার পর হিজবুল্লাহর বিরোধীরা আরও সাহসী হয়ে উঠছে। সম্প্রতি লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। যদিও তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারবে না, কিন্তু এই সিদ্ধান্ত সংগঠনটির বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দেয়।
শেষ লড়াইয়ের সম্ভাবনা
তবুও হিজবুল্লাহর বড় সুবিধা হলো তাদের প্রতিপক্ষের দুর্বলতা। লেবাননের সেনাবাহিনী দেশের সর্বত্র সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে প্রস্তুত নয়। সরকারেও হিজবুল্লাহবিরোধী নেতারা বিভক্ত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিয়া সম্প্রদায়ের সমর্থন। লেবাননের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ শিয়া মুসলিম। অনেকেই হিজবুল্লাহর দুর্নীতি ও সহিংসতায় অসন্তুষ্ট, কিন্তু বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি না থাকায় তারা সংগঠনটির ওপর নির্ভর করে। ২০২৫ সালের সংসদ নির্বাচনে হিজবুল্লাহ ভালো ফলও করেছে।
সংগঠনটি সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ মেনে নেবে না। তাদের অস্ত্রই তাদের পরিচয়ের অংশ। এমনকি তাদের পতাকায়ও একটি রাইফেলের প্রতীক রয়েছে। তবে আংশিক নিরস্ত্রীকরণের সম্ভাবনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা হয়েছে। লেবাননের সেনাবাহিনী লিতানি ও আওয়ালি নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার একটি পরিকল্পনাও দিয়েছে।
রাষ্ট্র শক্তিশালী করাই মূল পথ
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ধীরে ধীরে হিজবুল্লাহর প্রভাব কমাতে পারে। এর জন্য লেবাননের রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করা জরুরি। কিছু সহায়তা অপচয় হবে বা চুরি হবে—এটি বাস্তবতা। তবুও এই বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী লেবাননের পুনর্গঠনে অন্তত ১১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। যদি সরকার জনগণকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিশেষ করে শিয়া জনগোষ্ঠী আবার হিজবুল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের উচিত লেবানন সরকার ও ইসরায়েলের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা। যুদ্ধবিরতি ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আলোচনার পথ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারও আলোচনার অংশ হওয়া উচিত। কারণ যতদিন ইসরায়েল লেবাননের ভূখণ্ড দখল করে রাখবে, ততদিন হিজবুল্লাহ নিজেদের অস্ত্রধারণকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও কূটনৈতিক সাফল্যও হিজবুল্লাহকে দুর্বল করতে পারে। যদি ইরান অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে তারা তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে না পারে, তাহলে হিজবুল্লাহর শক্তি আরও কমে যাবে।
সব মিলিয়ে হিজবুল্লাহ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু ক্রমাগত চাপ অব্যাহত থাকলে সংগঠনটিকে দুর্বল করে রাখা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















