০৩:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
ইরান যুদ্ধে আমিরাতের হিসাব: ১২ নিহত, ১৯০ আহত, আটকানো হয়েছে ২ হাজারেরও বেশি ড্রোন পোপ ইরান যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানালেন, ট্রাম্পকে সরাসরি বার্তা সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল নিয়ে সংসদে তীব্র বিতর্ক: বিএনপি বলছে সংবিধানে নেই, জামায়াত বলছে জনরায় মানতে হবে ইসরায়েলের পারমাণবিক স্থাপনার কাছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ১৮০ জনের বেশি আহত ইরান যুদ্ধের আঁচে বিশ্বজুড়ে সার ও জ্বালানির দাম লাফিয়ে বাড়ছে, বাংলাদেশও ঝুঁকিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিনিয়োগ: ওপেনএআইয়ের মূল্যায়ন দাঁড়াল ৮৫২ বিলিয়ন ডলারে মালদ্বীপে প্রবাসী শ্রমিকদের আবাসনে আগুন: পাঁচ বাংলাদেশি নিহত, দুইজন গুরুতর আহত ইরানের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্পের, যুদ্ধাপরাধের সতর্কবার্তা দিলেন বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্রের পর যুক্তরাজ্যও আফ্রিকার সাহায্য অর্ধেক কমাচ্ছে, ‘টিকে থাকা অসম্ভব’ বলছে সংস্থাগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ বাড়াতে গিয়ে হাজারো কর্মী ছাঁটাই করল ওরাকল

 ইরানের শাসনব্যবস্থা কতদিন টিকে থাকবে? পরিবর্তন আসছে, তবে দ্রুত নয়

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদ্‌যাপনের কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিহত হয়, সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন অটল মনে হওয়া ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা গভীর সংকটে পড়ে। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের মৃত্যু দেশের ক্ষমতার কাঠামোতে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, এই পরিস্থিতি ইরানে গণঅভ্যুত্থানের পথ খুলে দিতে পারে এবং তিনি ইরানিদের নিজেদের সরকার দখল করার আহ্বানও জানিয়েছেন।

তবে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। শাসনব্যবস্থার অবশিষ্ট অংশ এখনও শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং গভীরভাবে প্রোথিত। বহু বছর ধরে তারা এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের কঠোর দমন-পীড়নের ফলে সাধারণ ইরানিরা সংগঠিতভাবে শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো অবস্থায় নেই। তাই যুদ্ধ শেষ হলে সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা শাসনব্যবস্থার একটি রূপ হয়তো টিকে থাকবে, যদিও সেটি আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল ও ক্ষতবিক্ষত হবে।

কেন সবসময় ইসরাইলের পাশে যুক্তরাষ্ট্র?

দীর্ঘমেয়াদে ইরানে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান সেই পরিবর্তন দ্রুত ঘটাবে—এমন সম্ভাবনা কম। যুদ্ধ শেষ হলে ইরান একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থির পরিবর্তনপর্বে প্রবেশ করবে। তখন যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত ইরানের বিভিন্ন শক্তিশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যাতে পরাজিত ও অজনপ্রিয় শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিরা সেই আলোচনাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে না পারে। এজন্য যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আগেভাগেই পরিকল্পনা করতে হবে এবং যুক্তিসঙ্গত আলোচনাসঙ্গী খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনার লক্ষণ দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র শুধু এই আশায় থাকতে পারে না যে শাসনব্যবস্থা নিজে থেকেই ভেঙে পড়বে বা জনগণ সহজেই তা উৎখাত করবে। সামরিক চাপ ও কূটনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ইরানকে আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথ তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও টিকে থাকার প্রস্তুতি

সাম্প্রতিক হামলার আগেই ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আরব বিশ্বজুড়ে তাদের মিত্রগোষ্ঠীগুলো গত দুই বছরের ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও বড় ধাক্কা খায়, যা দীর্ঘদিন দেশটির গর্বের প্রতীক ছিল।

২০২৬ সালের শুরুতে ইরানের অর্থনীতি কঠিন সংকটে পড়ে। মুদ্রার মান দ্রুত কমতে থাকে, পানীয় জল ও জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেয় এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ১৯৭৯ সালে শাহের পতনের পর এমন মাত্রায় সরকারবিরোধী জনঅসন্তোষ খুব কমই দেখা গেছে। জানুয়ারিতে বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোরতা তাদের গভীর আতঙ্ক ও ক্ষমতা ধরে রাখার মরিয়া প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। মানবাধিকার কর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, সেই দমন-পীড়নে অন্তত সাত হাজার মানুষ নিহত হয়।

US and Israel launch massive attack on Iran - POLITICO

এখন তেহরানের বৃদ্ধ বিপ্লবী নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মুখোমুখি, যার লক্ষ্য কার্যত শাসনব্যবস্থাকে অক্ষম করে দেওয়া। বোমাবর্ষণে ইরানের আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে, বহু রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং শাসন কাঠামো ভেঙে পড়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের হোটেল, বিমানবন্দর ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, যা দেশটির আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়িয়েছে।

তবুও স্বল্পমেয়াদে তেহরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ইসলামি প্রজাতন্ত্র এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে সংকটেও টিকে থাকা যায়। দীর্ঘদিন ধরে তারা বিকল্প কাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক হামলার পরও শাসকগোষ্ঠীর অবশিষ্ট অংশ নিজেদের রক্ষা ও ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

দেশটির জটিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে সাজানো যে উপরের স্তর থেকে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সহজ হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ কমে যায়। গত জুনে হামলার পর খামেনি সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কায় নেতৃত্বের বিকল্প হিসেবে চারজন সম্ভাব্য উত্তরসূরির তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে নিচের স্তরের সামরিক কমান্ডারদের কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যাতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হয়।

ইরানের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সংকট সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর বিদ্রোহ, জাতিগত সংঘর্ষ ও ইরাকের আগ্রাসনের মুখেও তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছিল। আবার ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পরও নেতৃত্ব পরিবর্তনের কঠিন সময় তারা অতিক্রম করেছে। এই অভিজ্ঞতার কারণে তারা মনে করে বর্তমান সংকটও পার করা সম্ভব।

After the strike: The danger of war in Iran | Brookings

অন্যদিকে শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে চাইলে সাধারণ ইরানিদের সামনে বড় বাধা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকার বিরোধীদের হত্যা বা দুর্বল করে দিয়েছে। বিরোধীরা বিভক্ত, তাদের হাতে অস্ত্র নেই এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শাসনব্যবস্থার হাতে এখনও এমন শক্তি আছে যা দিয়ে তারা বিদ্রোহ দমন করতে পারে। তাই যুদ্ধ শেষ হওয়ার দিনেও ক্ষমতার ভারসাম্য সম্ভবত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবশিষ্ট অংশের পক্ষেই থাকবে।

তবুও পরিবর্তনের সম্ভাবনা

যদিও বর্তমান সংঘর্ষের পরেও শাসনব্যবস্থা টিকে যেতে পারে, কিন্তু এটি অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বড় সামরিক পরাজয়ের পর একসময় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। গত ৩৬ বছরে ইরানে কোনো নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়নি। খামেনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ঠিক করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু তাদের অনেকেই এখন আর জীবিত নেই।

যুদ্ধের আগেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রশ্নটি জটিল ছিল। সম্ভাব্য উত্তরসূরি ইব্রাহিম রাইসি ২০২৪ সালের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান। আর বিপ্লবের সময়কার প্রজন্মের অধিকাংশই এখন মৃত বা অত্যন্ত বৃদ্ধ।

যুদ্ধ শেষে ক্ষমতার ভেতরে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে আলি লারিজানি ও সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো ব্যক্তিরা বিপ্লব-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু তাদের সামনে থাকবে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জ।

Iran Strikes the US Embassy in Saudi Arabia as War Expands Yet Again |  Military.com

এ কারণে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার শক্ত অবস্থান আগের মতো আর ফিরে পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প—পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি—এই সংকটের মধ্যে উল্টো বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে।

কূটনীতির সুযোগ

শুধু সামরিক হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারবে না। কিন্তু কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামোতে প্রভাব রাখার সুযোগ রয়েছে। যুদ্ধ শেষে যেই নেতৃত্বই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের সঙ্গে আলোচনা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে বর্তমান ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর আধিপত্য আরও মজবুত না হয়।

ইতিমধ্যে খবর এসেছে যে কিছু বাস্তববাদী ইরানি নেতা ওমানের মধ্যস্থতায় আবার পারমাণবিক আলোচনা শুরু করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভুল চুক্তি হলে সেটি দুর্বল শাসনব্যবস্থার জন্য নতুন জীবনরেখা হয়ে উঠতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কার সঙ্গে আলোচনা করবে এবং সেই আলোচনার শর্ত কী হবে।

ভবিষ্যতের যে কোনো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এমন লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত যাতে ইরানে স্থায়ী ও অর্থবহ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়। যুদ্ধ ইতিমধ্যে ইরানের অনেক সামরিক হুমকি কমিয়ে দিয়েছে—পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী সবই দুর্বল হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সুযোগ রয়েছে এমন একটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার, যা এতদিন প্রায় উপেক্ষিত ছিল—ইরানের জনগণ যেন তাদের প্রাপ্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে আমিরাতের হিসাব: ১২ নিহত, ১৯০ আহত, আটকানো হয়েছে ২ হাজারেরও বেশি ড্রোন

 ইরানের শাসনব্যবস্থা কতদিন টিকে থাকবে? পরিবর্তন আসছে, তবে দ্রুত নয়

০৭:২৭:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদ্‌যাপনের কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিহত হয়, সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন অটল মনে হওয়া ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা গভীর সংকটে পড়ে। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের মৃত্যু দেশের ক্ষমতার কাঠামোতে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, এই পরিস্থিতি ইরানে গণঅভ্যুত্থানের পথ খুলে দিতে পারে এবং তিনি ইরানিদের নিজেদের সরকার দখল করার আহ্বানও জানিয়েছেন।

তবে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। শাসনব্যবস্থার অবশিষ্ট অংশ এখনও শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং গভীরভাবে প্রোথিত। বহু বছর ধরে তারা এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের কঠোর দমন-পীড়নের ফলে সাধারণ ইরানিরা সংগঠিতভাবে শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো অবস্থায় নেই। তাই যুদ্ধ শেষ হলে সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা শাসনব্যবস্থার একটি রূপ হয়তো টিকে থাকবে, যদিও সেটি আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল ও ক্ষতবিক্ষত হবে।

কেন সবসময় ইসরাইলের পাশে যুক্তরাষ্ট্র?

দীর্ঘমেয়াদে ইরানে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান সেই পরিবর্তন দ্রুত ঘটাবে—এমন সম্ভাবনা কম। যুদ্ধ শেষ হলে ইরান একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থির পরিবর্তনপর্বে প্রবেশ করবে। তখন যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত ইরানের বিভিন্ন শক্তিশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যাতে পরাজিত ও অজনপ্রিয় শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিরা সেই আলোচনাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে না পারে। এজন্য যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আগেভাগেই পরিকল্পনা করতে হবে এবং যুক্তিসঙ্গত আলোচনাসঙ্গী খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনার লক্ষণ দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র শুধু এই আশায় থাকতে পারে না যে শাসনব্যবস্থা নিজে থেকেই ভেঙে পড়বে বা জনগণ সহজেই তা উৎখাত করবে। সামরিক চাপ ও কূটনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ইরানকে আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথ তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও টিকে থাকার প্রস্তুতি

সাম্প্রতিক হামলার আগেই ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আরব বিশ্বজুড়ে তাদের মিত্রগোষ্ঠীগুলো গত দুই বছরের ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও বড় ধাক্কা খায়, যা দীর্ঘদিন দেশটির গর্বের প্রতীক ছিল।

২০২৬ সালের শুরুতে ইরানের অর্থনীতি কঠিন সংকটে পড়ে। মুদ্রার মান দ্রুত কমতে থাকে, পানীয় জল ও জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেয় এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ১৯৭৯ সালে শাহের পতনের পর এমন মাত্রায় সরকারবিরোধী জনঅসন্তোষ খুব কমই দেখা গেছে। জানুয়ারিতে বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোরতা তাদের গভীর আতঙ্ক ও ক্ষমতা ধরে রাখার মরিয়া প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। মানবাধিকার কর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, সেই দমন-পীড়নে অন্তত সাত হাজার মানুষ নিহত হয়।

US and Israel launch massive attack on Iran - POLITICO

এখন তেহরানের বৃদ্ধ বিপ্লবী নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মুখোমুখি, যার লক্ষ্য কার্যত শাসনব্যবস্থাকে অক্ষম করে দেওয়া। বোমাবর্ষণে ইরানের আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে, বহু রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং শাসন কাঠামো ভেঙে পড়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের হোটেল, বিমানবন্দর ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, যা দেশটির আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়িয়েছে।

তবুও স্বল্পমেয়াদে তেহরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ইসলামি প্রজাতন্ত্র এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে সংকটেও টিকে থাকা যায়। দীর্ঘদিন ধরে তারা বিকল্প কাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক হামলার পরও শাসকগোষ্ঠীর অবশিষ্ট অংশ নিজেদের রক্ষা ও ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

দেশটির জটিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে সাজানো যে উপরের স্তর থেকে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সহজ হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ কমে যায়। গত জুনে হামলার পর খামেনি সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কায় নেতৃত্বের বিকল্প হিসেবে চারজন সম্ভাব্য উত্তরসূরির তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে নিচের স্তরের সামরিক কমান্ডারদের কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যাতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হয়।

ইরানের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সংকট সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর বিদ্রোহ, জাতিগত সংঘর্ষ ও ইরাকের আগ্রাসনের মুখেও তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছিল। আবার ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পরও নেতৃত্ব পরিবর্তনের কঠিন সময় তারা অতিক্রম করেছে। এই অভিজ্ঞতার কারণে তারা মনে করে বর্তমান সংকটও পার করা সম্ভব।

After the strike: The danger of war in Iran | Brookings

অন্যদিকে শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে চাইলে সাধারণ ইরানিদের সামনে বড় বাধা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকার বিরোধীদের হত্যা বা দুর্বল করে দিয়েছে। বিরোধীরা বিভক্ত, তাদের হাতে অস্ত্র নেই এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শাসনব্যবস্থার হাতে এখনও এমন শক্তি আছে যা দিয়ে তারা বিদ্রোহ দমন করতে পারে। তাই যুদ্ধ শেষ হওয়ার দিনেও ক্ষমতার ভারসাম্য সম্ভবত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবশিষ্ট অংশের পক্ষেই থাকবে।

তবুও পরিবর্তনের সম্ভাবনা

যদিও বর্তমান সংঘর্ষের পরেও শাসনব্যবস্থা টিকে যেতে পারে, কিন্তু এটি অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বড় সামরিক পরাজয়ের পর একসময় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। গত ৩৬ বছরে ইরানে কোনো নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়নি। খামেনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ঠিক করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু তাদের অনেকেই এখন আর জীবিত নেই।

যুদ্ধের আগেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রশ্নটি জটিল ছিল। সম্ভাব্য উত্তরসূরি ইব্রাহিম রাইসি ২০২৪ সালের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান। আর বিপ্লবের সময়কার প্রজন্মের অধিকাংশই এখন মৃত বা অত্যন্ত বৃদ্ধ।

যুদ্ধ শেষে ক্ষমতার ভেতরে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে আলি লারিজানি ও সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো ব্যক্তিরা বিপ্লব-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু তাদের সামনে থাকবে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জ।

Iran Strikes the US Embassy in Saudi Arabia as War Expands Yet Again |  Military.com

এ কারণে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার শক্ত অবস্থান আগের মতো আর ফিরে পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প—পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি—এই সংকটের মধ্যে উল্টো বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে।

কূটনীতির সুযোগ

শুধু সামরিক হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারবে না। কিন্তু কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামোতে প্রভাব রাখার সুযোগ রয়েছে। যুদ্ধ শেষে যেই নেতৃত্বই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের সঙ্গে আলোচনা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে বর্তমান ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর আধিপত্য আরও মজবুত না হয়।

ইতিমধ্যে খবর এসেছে যে কিছু বাস্তববাদী ইরানি নেতা ওমানের মধ্যস্থতায় আবার পারমাণবিক আলোচনা শুরু করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভুল চুক্তি হলে সেটি দুর্বল শাসনব্যবস্থার জন্য নতুন জীবনরেখা হয়ে উঠতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কার সঙ্গে আলোচনা করবে এবং সেই আলোচনার শর্ত কী হবে।

ভবিষ্যতের যে কোনো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এমন লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত যাতে ইরানে স্থায়ী ও অর্থবহ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়। যুদ্ধ ইতিমধ্যে ইরানের অনেক সামরিক হুমকি কমিয়ে দিয়েছে—পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী সবই দুর্বল হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সুযোগ রয়েছে এমন একটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার, যা এতদিন প্রায় উপেক্ষিত ছিল—ইরানের জনগণ যেন তাদের প্রাপ্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।