ইরানের সঙ্গে শুরু করা যুদ্ধে দুই সপ্তাহ পেরোতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে। সামনে দুটি পথ—যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য পূরণ করা, অথবা বিজয়ের দাবি তুলে ধীরে ধীরে পিছু হটা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুটো পথই ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বয়ে আনতে পারে।
যুদ্ধের সাফল্য, কিন্তু ঝুঁকি আরও বড়
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌ সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এতে যুদ্ধের সমাপ্তি আসেনি। ইরান এখনও বিকল্প কৌশলে পাল্টা আঘাত হানছে, যার মধ্যে সাইবার হামলা, সমুদ্রপথে বাধা সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক হামলা উল্লেখযোগ্য।
যুদ্ধ চালিয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণহানি বাড়বে, অর্থনৈতিক চাপ তীব্র হবে এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দুর্বল হতে পারে। ইতোমধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার বেশিরভাগই ইরানের নাগরিক।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ
ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ প্রায় অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
তেলবাহী জাহাজে হামলার আশঙ্কায় অনেক কোম্পানি ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন এই পথ নিরাপদ রাখতে মিত্রদের সহযোগিতা চাইছে, কিন্তু অনেক দেশ ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে না।
রাজনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও এখন দ্বিধা স্পষ্ট। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তার রাজনৈতিক ভিত্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, তিনি আগে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এদিকে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। অনেক দেশ অভিযোগ করছে, যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি।
ইরানের ক্ষমতা এখনো অটুট
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। বরং নতুন নেতৃত্ব যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও মিলিশিয়ারা এখনও সক্রিয় রয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, ইরানের কাছে এখনো বিপজ্জনক মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্রে রূপ নিতে পারে। এই মজুদ উদ্ধার করতে হলে স্থল অভিযান চালাতে হবে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নতুন হুমকি: সাইবার হামলা ও ছড়িয়ে পড়া সংঘাত
ইরান এখন সাইবার যুদ্ধেও সক্রিয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কিছু সহিংস ঘটনার সঙ্গে এই যুদ্ধের প্রভাব যুক্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদিও এসব ঘটনার প্রমাণ এখনো স্পষ্ট নয়।
সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
এই যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। সামনে বড় দুটি প্রশ্ন—ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা দখল করা হবে কি না, এবং পারমাণবিক উপাদান উদ্ধার করতে স্থল অভিযান চালানো হবে কি না।
এই দুই সিদ্ধান্তই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















