বহুদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের অনেক গৌরবউজ্জ্বল ইতিহাস আছে। স্বাধীনতা সংগ্রামেরও গৌরবউজ্জ্বল ইতিহাস আছে। এমনকি পৃথিবীতে বহু বড় বড় যুদ্ধও ঘটে গেছে। কিন্তু সব যুদ্ধ ও সব সংগ্রামের ইতিহাস মহাকাব্যের মর্যাদা পায় না।
বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম যে একটি মহাকাব্য সৃষ্টি করেছে তা প্রথম উল্লেখ করেন রবীন্দ্র-পরবর্তী পণ্ডিত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৭২ সালে তার একটি লেখায়। যা পরবর্তীকালে তার “বাংলাদেশ” বইয়ে স্থান পেয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে বারবার অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে। বদল করা হয়েছে ইতিহাসের সত্য বারবার। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ইতিহাস নিয়ে এমন খেলা কোন এক পর্যায়ে মানুষকে ইতিহাসবিমুখ করে—তাই সচেতন বা অবচেতন মনে হোক। বাংলাদেশেও তা ঘটেছে।

তারপরেও ২০১১ সালে নিতীশ সেনগুপ্তের “ল্যান্ড অফ টু রিভারস” (Land of Two Rivers) বইটি হাতে পাই দিল্লির খান মার্কেটের ব্যারিসন্স বুক সেলারে। বুক শপটির সেলসম্যান ও ম্যানেজাররা পরিচিত হওয়ায় তাদের একজন বইটি নতুন আসা বইয়ের ভেতর থেকে এনে হাতে তুলে দেয়। বইটি নেড়ে চেড়ে দেখে বুঝতে পারি, এখানে বেঙ্গল ও বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাসের নতুন কিছু নেই—সবই কমবেশি যারা ইতিহাস পড়েন তাদের জানা। তারপরেও বইটি না কিনে পারেনি বইটির প্রচ্ছদে লেখা বইয়ের বিস্তারিত নামের কারণে। বইটির প্রচ্ছদে বেঙ্গল ডেলটার ম্যাপের মধ্যে লেখা, “এ হিস্টরি অফ বেঙ্গল ফ্রম দি মহাভারত টু মুজিব” (A History of Bengal from the Mahabharat to Mujib)।
নিজের মধ্যে একটা ভিন্ন অনুভূতি এসেছিল। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এখান থেকে সামান্য দূরের একটি ভূগোলে ঘটে যাওয়া ঘটনার ওপর পৃথিবীর অন্যতম মহাকাব্য “মহাভারত”। আর ল্যান্ড অফ টু রিভার্স বইয়ের লেখক নিতীশ সেনগুপ্ত তাঁর বইয়ের প্রচ্ছদে লিখেছেন, “মহাভারত টু মুজিব”। তিনি মহাভারতের সব থেকে বীর চরিত্র “অর্জুন টু মুজিব” লিখতে পারতেন। বা লিখতে পারতেন “মহাভারত টু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ”। কিন্তু তিনি লিখেছেন “মহাভারত টু মুজিব”।
বাস্তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র ও বিজয় অর্জনের বিশেষত্ব লেখক লিখেছেন বইয়ের ৫৫০ ও ৫৫১ পাতায়।

সেখানে তিনি লিখছেন, ১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে মুজিব সমগ্র প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিজের অধীনে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকা পালন করেন। একটি দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ওই দেশের নেতার প্রতি সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র ও মানুষের এ ধরনের আনুগত্যের নজির বা উদাহরণ পৃথিবীতে নেই। যে অকুণ্ঠ সমর্থন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ও রাষ্ট্রযন্ত্র মুজিবকে দিয়েছিল ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে—তা গান্ধী, নেহরু, মাও দেজ দং , হো চি মিন, নক্রুমা, জুলিয়াস নিয়েরেরে, এমনকি নেলসন ম্যান্ডেলাও স্বাধীনতা অর্জনের আগে পাননি। এটা কেবলমাত্র পূর্ব পাকিস্তানে ঘটেছিল, সেখানকার রাষ্ট্রযন্ত্র ও মানুষ বিদ্রোহী নেতাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল—তারা উপলব্ধি করেছিল যে তাদের নেতা ‘বাংলাদেশ’-এর জনগণের পক্ষে সেই বৈধতা ও অথরিটি অর্জন করেছেন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসার ফলে।
এর পরে লেখক উল্লেখ করেছেন, মার্চ মাসের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩২ নম্বর বাড়িতে বিভিন্ন পেশার মানুষ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যক্তিরা যে প্রতিদিন তাঁর সঙ্গে মিটিং করছেন, দেখা করছেন, তাঁর নির্দেশ মানছেন—সে প্রসঙ্গ নিয়ে।

এর সঙ্গে লেখক আর যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন, ওই সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল সর্বোচ্চ ভালো। এমনকি অবাঙালীরাও নিরাপদ ছিল।আবার ওই সময়ে বাস্তবতা উপলব্ধি করে অনেক বিদেশি রাষ্ট্র মুজিব ও তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে দেয়। সর্বোপরি বিশ্ব মিডিয়া ততক্ষণে তাদের রিপোর্ট ও লেখার মাধ্যমে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করে ফেলেছে।
এর পরে লেখক বইয়ের ৫৫৩, ৫৫৪ ও ৫৫৫ পৃষ্ঠায় ইতিহাসের পুরোনো তথ্য তাঁর বই ও ইতিহাসের প্রয়োজনে উল্লেখ করেছেন, যথাক্রমে ২৬ মার্চ ০০.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার পরে একটি গোপন বেতার থেকেও সে ঘোষণা ২৬ মার্চই প্রচার করা হয়।এমনকি সেখান থেকে বারবার ঘোষণাও দেওয়া হয় শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ২৭ মার্চ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে রিভোল্ট করা মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের একটি রেডিও স্টেশন থেকে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যেখানে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তিনি এটা করছেন।

এর পরে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের তথ্য ও ইয়াহিয়া খান কর্তৃক আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার তথ্য তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসের এসব তথ্য বারবার ঘুরপাক খায় ক্ষুদ্রতার মধ্যে।
এ ক্ষুদ্রতার কারণে মহাকাব্য “মুজিব” আজ নিষিদ্ধ, তার সকল কীর্তি মুছে দেওয়ার কী সীমাহীন চেষ্টা আজ চারদিকে। এমনকি লেখক যে ৩২ নম্বর বাড়ির কথা উল্লেখ করেছেন—যেখানে বসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বে বিরল এমন ইতিহাসের সাক্ষ্য রেখেছিলেন—সে বাড়ি ইউনূস ও তার উত্তরসূরিরা ভেঙে ফেলেছে। এমনকি ৭১-এর ২৬ মার্চের মতো ২০২৬ মার্চেও দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
তাই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, বাঙালির—
“ভাগ্যটা যেন ঘোলা জলের ডোবা,
বড় রকম ইতিহাস ধরে না তার মধ্যে,”
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 



















