২০২৬ সালে যে প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে “১৯৭১ অবরুদ্ধ দেশে স্পার্টাকাস” নামে একটি বই বের হবে এমনটি ভাবাও এ পরিবেশে বসে ভুল। কিন্তু কোন সাহসী তরুণ নয়, জাতির সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেখক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনই লিখেছেন সে বইটি। এবং দেশের বড় প্রকাশনা সংস্থা অনন্যা বইটি প্রকাশ করেছে।
বইটির ভূমিকাতে শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক প্রয়াত এনায়েতুল্লাহ খানের সেই বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত লেখার উল্লেখ আছে। যে লেখা দেশকে বিভক্ত করতে বিশেষ করে শিক্ষিত মিডলক্লাসকে বিভক্ত করতে বড় ভূমিকা পালন করেছিল মুক্তিযুদ্ধের পরে। “সিক্সটি মিলিয়ন কলাবরেটর (৬ কোটি রাজাকার)” শিরোনামের লেখাটি।
যদিও এই বই নিয়ে লেখার আগে ওই লেখাটির পেছনের ইতিহাসটি একটু বলা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আজকের এই বিভ্রান্ত সময়ে যতই শ্রদ্ধেয়জনদের সম্পর্কে একটু অপ্রিয় সত্য বের হয়ে আসবে তবুও বলা উচিত বলে মনে করছি।
সিক্সটি মিলিয়ন কলাবরেটর লেখাটি একটি ফরমায়েশি লেখা ছিল। এবং এর উদ্যোক্তা ছিলেন মুজিবনগর থেকে ফিরে আসা শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক এ বি এম মুসা।

১৯৭১ মুজিবনগর থেকে ফিরে এসে এ বি এম মুসা ওই সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ডি.জি হন। অন্যদিকে চরমপত্র খ্যাত এম আর আকতার মুকুল বাংলাদেশ বেতারের ডি.জি হন। এ বি এম মুসা অত্যন্ত তরুণ বয়স থেকে প্রখ্যাত সাংবাদিক হওয়া সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে তিনি কোন অনন্য বা নতুন উজ্জ্বলতায় বের হয়ে আসতে পারেননি। অন্যদিকে এম আর আকতার মুকুল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার নিজের লেখা ও পাঠ করা বিখ্যাত অনুষ্ঠান চরমপত্রের মাধ্যমে তিনি পৌঁছে যান অনন্য এক জনপ্রিয়তায়। বলা যেতে পারে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অন্যতম জনপ্রিয় ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ক অনুষ্ঠান ছিল চরমপত্র।
যাহোক, মূল প্রসঙ্গে আসি, বেতারের ডি.জি’র দায়িত্ব নেবার পরেই এম আর আকতার মুকুল প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী, ফেরদৌসী রহমান, শাহনাজ রহমাতুল্লাহ, রুনা লায়লা প্রমুখ যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান রেডিওতে গান গেয়েছেন— তাদেরকে ব্ল্যাকলিস্টেড করেন।
এ নিয়ে এবিএম মুসা ও এম আর আকতার মুকুলের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দুজনেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এবিএম মুসা একদিন এম আর আকতার মুকুলকে বলেন, তুমি এদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা না তুললে তো আমি টিভি চালাতে পারছি না।
এম আর আকতার মুকুল তাকে বলেন, একটু সময় নেওয়া প্রয়োজন। এখনই এদেরকে সামনে এনো না। তাহলে প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে যে শিল্পীরা স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে যোগ দিয়েছিল তাদেরকে ছোট করা হবে।
এবিএম মুসা তাকে যুক্তি দেন, দেখ সবাই তো স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে যেতে পারেননি।
এম আর আকতার মুকুল পাল্টা যুক্তি দেন, দেশের মধ্য থেকেই তো আলতাফ মাহমুদ প্রাণ দিয়েছেন। তাই দেশের মধ্যে থাকা আর মুজিবনগরে যাওয়া বড় বিষয় নয়, যারা পাকিস্তানিদের সহায়তা করেছে তাদেরকে এখনই সামনে আনা ঠিক নয়। আরেকটু সময় নেওয়া দরকার।
এর পরেই এনায়েতুল্লাহ খান ও আতাউস সামাদকে একটি লেখা লিখতে বলেন এবিএম মুসা, যার মূল বক্তব্য হবে, যারা মুজিবনগরে যায়নি তারা সকলে কি পাকিস্তানিদের কলাবরেটর? আতাউস সামাদ রাজি হননি ওই লেখা লিখতে। এনায়েতুল্লাহ খান তাঁর হলিডেতে “সিক্সটি মিলিয়ন কলাবরেটর” শিরোনামে ওই লেখা লেখেন।

“সিক্সটি মিলিয়ন কলাবরেটর” শিরোনামের এই লেখার নেপথ্য ইতিহাস এম আর আকতার মুকুল ভাই নব্বই দশকে সাগর পাবলিশার্সে বসে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেন। এম আর আকতার মুকুল এবং আমাদের বয়সের যে পার্থক্য সে হিসেবে আমাদের কাছে তাঁর অসত্য বলার কিছু ছিল না। তারপরেও একপক্ষীয় বক্তব্য কখনই সত্য হিসেবে ধরার সুযোগ নেই। যে কারণে বারবার সুযোগ নিতে থাকি কীভাবে আতাউস সামাদ ভাইয়ের কাছ থেকে এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়। বিভিন্ন দিনে নানান গল্প করা ও কথা বলার সুযোগে একদিন এ প্রসঙ্গ তোলার সুযোগ পাই। এবং আতাউস সামাদ ভাই এর সত্যতা স্বীকার করেন। এবং তিনি এও বলেন, তিনি লিখতে রাজি হননি। কারণ, তাঁর মনে হয়েছিল— এ ধরনের লেখা জাতিকে বিভক্ত করবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, তার ভাইপো উলফাত, ও তাদের বন্ধু মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া এরা যে অপারেশন ঢাকায় চালিয়েছিল— তার কয়েকটি তাঁর গাড়ি ব্যবহার করে। এমনকি তিনি নিজেও সে গাড়ি চালিয়েছিলেন। হাত থেকে বারুদের গন্ধ তুলতে তাকে পেট্রল দিয়ে হাত ধুতে হয়েছিল। আর ওই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কত বাড়িতে না আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তাই দেশের ভেতরের মানুষকে এইভাবে চিহ্নিত করা তিনি ঠিক কাজ হিসেবে মনে করেননি। যে কারণে তিনি লিখতে রাজি হননি।
মুনতাসীর মামুনের “১৯৭১ অবরুদ্ধ দেশে স্পার্টাকাস” বইটি নিয়ে লেখার আগে এই নেপথ্যের ঘটনাটুকু তুলে ধরলাম এ কারণে যে কত ক্ষুদ্র স্বার্থে ও ব্যক্তিস্বার্থে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভগুলো বদলে গেছে। আর যার সুযোগে আজ মুক্তিযুদ্ধ নির্বাসিত। বিতর্কিত। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মহায়নায়ক বঙ্গবন্ধুকে অপমান করার মতো শত শত সন্তান এখন রাস্তা থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা অবধি দেখা যায়। যা খুবই চমৎকারভাবে মুনতাসীর মামুন তাঁর বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন— “৭১-এর প্রজন্ম অনেকের ভাষায় এখন ‘নিকৃষ্টতম প্রজন্ম’। একাত্তরের অর্জন কিছুই না, বঙ্গবন্ধু বা শেখ মুজিবের যেন সবচেয়ে বড় অপরাধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলা।”

মুনতাসীর মামুনের এ বইটিতে ৩৯টি অধ্যায়। মূলত গবেষণা কর্ম তার।
কিন্তু এ এক ভিন্নধারার গবেষণা। কারণ বইয়ে গণহত্যার গ্রাফ, ডায়াগ্রাম সবই যেমন আছে তেমনি এর সঙ্গে আছে বিভিন্ন কবিদের কবিতা। অধিকাংশ কবিতা আমাদের ৫০ ও ৬০-এর দশকের কবিদের। শুধু একটি কবিতা ৮০ দশকের কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর। এবং বলার প্রয়োজন পড়ে না— “জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন”— লাইন সম্বলিত কবিতাটি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবরুদ্ধ দেশের মানুষের বাস্তবতা গবেষণা করতে গিয়ে কেন তিনি আমাদের ৫০ ও ষাটের দশকের কবিদের এত কবিতা ব্যবহার করলেন? এ প্রশ্ন যে কারোরই আসতে পারে।
তবে আমার মতামত, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম অর্থাৎ বাইশ বছরের ওই সংগ্রাম তো শুধু নয় মাসের একটি সশস্ত্র যুদ্ধ করার সংগ্রাম ছিল না। এটা একটি আধুনিক বাঙালি জাতি হিসেবে গড়ে ওঠারও সংগ্রাম ছিল। আর আমাদের এই সংগ্রামে শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে ওই দুই দশকের কবিদের ভূমিকা শুধু অনন্য নয়— সত্যি অর্থে রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতি গঠনে বাংলাদেশের এই কবিদের কবিতা অনন্য ভূমিকা রাখে। যদি আমাদের নতুন প্রজন্ম, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক প্রমুখ কবির কবিতার গভীরে যেত তাহলে হয়তো আজ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ এভাবে নির্বাসিত হতো না। বাঙালি সত্যি অর্থে এদের চর্চা করেনি। আশির দশকে বাংলা একাডেমিতে এক স্মারক বক্তৃতায় শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, জীবিত বাঙালি কবিদের মধ্যে (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ মিলে) নিঃসন্দেহে শামসুর রাহমান শ্রেষ্ঠ কবি। বাঙালির সন্তানরা ঠিকমতো শামসুর রাহমান পড়লেও মব কালচারের এই নষ্ট প্রজন্ম তৈরি হতো না।

মুনতাসীর মামুন তাঁর বইয়ের ভূমিকায় ব্যবহার করেছেন, আসাদ চৌধুরীর কবিতা। আর বইয়ের ভেতরে প্রথমে আবুল হাসানের কবিতা, তারপরে নির্মলেন্দু গুণের কবিতা। এর পরে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ হক প্রমুখের কবিতা।
বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পাতায় বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের স্বাধীনতা নিয়ে একটি লেখার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত হয়েছে। সম্পাদক হিসেবে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের লেখা প্রায় পনের বছর ছাপার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তার থেকে বড় সৌভাগ্য হয়েছে, প্রুফ রিডাররা তাঁর লেখার শেষ প্রুফটি আমাকে দিয়ে দেখিয়ে নিতেন।যার ফলে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাঁর লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছে।
নজরুলের গদ্যে— কবিতা ও গদ্যের এক অদ্ভুত মিলন দেখা যায়— কখনও কবিতা গদ্যকে ছেয়ে ফেলে, কখনও গদ্য কবিতাকে ছায়ার নিচে ফেলে। গদ্য নিয়ে ছন্দের ও শব্দের এক অদ্ভুত খেলা সেখানে। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের গদ্য তেমনি যেন কবিতা ও গদ্য মিলে কখনও এক হয়, কখনও নদীর জলের তরঙ্গের মতো ভেঙে পড়ে।
মুনতাসীর মামুন তাঁর বইয়ে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ২১ মার্চ, ১৯৭১ ‘রানার’ নামক একটি পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার যে অংশ উদ্ধৃত করেছেন তার একটি লাইন এমনই— “যেন স্তব, যেন তীর্থ, দিনে কিংবা রাতে, কবজের মধ্যে কিংবা অবসরে মিছিল কিংবা সভায় স্তব করে চলেছি: স্বাধীনতা।”
এই অধ্যায় লেখকের নিজের অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার স্মৃতি। তার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি হত্যার নিষ্ঠুর ছবি উঠে এসেছে। অর্থাৎ ২৫ মার্চের গণহত্যার পরের দিনের স্মৃতি— তখনকার ঢাকার অদূরে পল্লবীর ঘটনা।
এর পরের অধ্যায় বাংলাদেশের নিশান (পতাকা) বাড়ির ছাদ থেকে হারিয়ে যাবার কাহিনিগুলো। তারপরে আবার মনের মধ্যে, বুকের মধ্যে বাংলাদেশের পতাকার অবস্থানের কাহিনী।
পঞ্চম অধ্যায় ‘অনিশ্চিত যাত্রা’— অর্থাৎ দেশের ভেতর ও ভারতে শরণার্থী হিসেবে যাত্রার সেই দুঃসহ স্মৃতি ও যাত্রা। আবার পরের অধ্যায়ে আসছে কাজে ফেরার জন্য বরিশাল থেকে ঢাকায় যাত্রা। মুসলমান হয়েও তাকে পরীক্ষা করে নিতে হচ্ছে কালেমা মুখস্ত আছে কিনা, পাকিস্তানি নিশান বুকে নিতে হচ্ছে। মাথায় পাকিস্তানি টুপি পরতে হচ্ছে।
লেখকের এই বইয়ে অনেকগুলো অধ্যায়ে একের পর এক গণহত্যার ঘটনা উঠে এসেছে। স্বাধীনতার অনেক পরে আবিষ্কৃত গণহত্যার কথাও উঠে এসেছে। তবে ১২তম অধ্যায়ে, যার শিরোনাম “গণহত্যা ও কাফকার জগত”, সেখানে তিনি সানডে টাইমসের একটি রিপোর্ট থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছেন। যা বইয়ের ১১০ পৃষ্ঠায় সেখানে দেখা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে পরাজিত করতে সাড়াশি আক্রমণ হিসেবে আওয়ামী লীগার শুধু নয়, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের কীভাবে হত্যা করা, হেনস্তা করা ও জেলে নেবার প্রক্রিয়া শুরু হয় সে সম্পর্কিত রিপোর্ট।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে যতবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি বিপন্ন হয়েছে এই একই ঘটনার নানা রঙে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে এমনিভাবে আক্রমণ করে নির্মূল করা, দাসে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে লেখকের এই গবেষণা শেষে- নিজের মন্তব্যের মধ্য দিয়ে বইটি শেষ হয়েছে একটা হতাশার মধ্য দিয়ে— তিনি লিখেছেন—
“এ শতাব্দীতে দু’জন শ্রেষ্ঠ বাঙালির নাম বাঙালির জনমানসে ভাস্বর হয়ে থাকবে। একজন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্যজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একজন বাংলা ভাষাকে রূপ দিয়েছিলেন। যার গান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। অন্যজন বাঙালির অনেক বছরের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন, সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিলেন, স্বাধীন এক ভূখণ্ডের— যার নাম বাংলাদেশ।
তাঁর নাম স্মরণে রেখেই অবরুদ্ধ দেশে ৩০ লাখ শহীদ হয়েছিলেন, মুজিবনগর সরকার পরিচালিত হয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিলেন, শরণার্থী থেকে মুক্তিযোদ্ধা, প্রবাসী বাঙালি, অবরুদ্ধ দেশের বাঙালি ১৯৭১ সালে স্বপ্ন দেখেছিল শুধু এক মুঠো ভাত, শোষণের অবসান, গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক সমাজ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু শহীদ হবার পরে সে বাংলাদেশ আর হয়ে ওঠেনি। অভিন্ন জাতীয়তাবাদ যে বন্ধনের সৃষ্টি করেছিল, তা আর থাকেনি, জাতি সম্পূর্ণভাবে বিভক্ত।
১৯৭১-এর পরেই কবি আসাদ চৌধুরি ৩০ লক্ষ শহীদ বিশেষ করে শহীদ বুদ্ধিজীবী, ধর্ষিতা আর নির্যাতিত মানুষকে স্মরণ করে প্রশ্ন রেখেছিলেন—
তোমার যা বলার ছিল
বলেছে কি তা বাংলাদেশ?

এ প্রশ্ন নিজেদের করাই ভালো। অবরুদ্ধ দেশের সেই সব মানুষ আজও দীর্ণ। স্পার্টাকাসের মতো উঠে দাঁড়াবার সাহস সে আর দেখাতে পারেনি। আজকের বাংলাদেশ কি তার উদাহরণ নয়?”
লেখক নিজেই লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা ৫০টির বেশি। সেই লেখককে যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হতাশ হতে দেখা যায়— তাঁর চোখে যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে দাস তৈরির পরিবেশ ধরা পড়ে— জাতির জন্য তা কি ভয়াবহ কোন অশনি সংকেত নয়?
বই পরিচিতি বা ছোট আকারের মধ্যে একটি বই নিয়ে লেখার লেখকরা ভিন্ন। তাদের ওই যোগ্যতা আমার নেই। তবে বইটি তিন দিনে দুই বার পড়েছি। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে— নতুন প্রজন্মকে এ ইতিহাস জানা প্রয়োজন। এমনকি যারা বয়োবৃদ্ধ তাদেরও স্মৃতিকে নাড়া দেওয়ার জন্য এ বই পড়া প্রয়োজন। সর্বোপরি, দুঃসময়ই মনে হয় লেখকের ভাষা ও আবেগকে আরও শানিত করে। তাই গবেষণা গ্রন্থ হলেও ভাষার টানে এ বই পড়তে খুব বেশি সময়ও লাগেনি।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 


















