বিশ্বজুড়ে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে ‘এপস্টেইন ফাইল’ শুধু এক ব্যক্তির কৃতকর্ম নয়, বরং গভীর কাঠামোগত সমস্যা উন্মোচন করেছে। এই কেলেঙ্কারি শুধু অপরাধীর দোষ নয়, এটি সেই সমাজের প্রতিফলন যা শক্তিশালীদের অপারাধকে সাধারণত অস্বীকার বা লুকিয়ে রাখে।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারির মূল শিক্ষা
আমেরিকার বিত্তশালী ও অভিজাতদের ক্ষতি করার ঘটনায় জেফরি এপস্টেইন একাই দোষী হলেও যে সমাজ ও পরিবেশ তাকে তৈরি করেছে, সেটাই আসল শিক্ষা। সাধারণ মতবাদে যখন শুধু একজন ‘দুষ্ট মানুষ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন মূল সমস্যাটা থেকে যায়—অসাম্যের শক্তিকেন্দ্র ও উপেক্ষা করা সমাজ। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা শুধু একক কাণ্ড নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অসুস্থতা, যা সমাজের মূল কাঠামো থেকেই জন্মে।
বিশ্বজুড়ে পুরুষ প্রধান ক্ষমতা কাঠামো সহিংসতা বাড়ানোর মূল কারণ। এই কাঠামোই এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে যেখানে ক্ষমতাসীনরা নির্দোষের দোষী বানিয়ে দিয়ে নিজেদের নিরাপদ মনে করে। সহিংসতার এই বিপরীতে দাঁড়ানো এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব, কিন্তু তা হলে সমাজকে গভীরভাবে বদলাতে হবে।
সমাজে সহিংসতা রোধে পরিবর্তন দরকার
এপস্টেইন কাণ্ড আমাদের শেখায় যে শুধু শাস্তি দিয়ে কাজ শেষ হবে না; সমাজের নৈতিকতা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি নীতি, সবাইকে লিঙ্গ সমতা, সম্মান ও উগ্র আচরণের প্রতিরোধ শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানদের মধ্যে সম্মান ও সমানাধিকার নিয়ে আলোচনার বিষয়গুলোকে প্রতিদিনের অংশ বানাতে হবে।
বিশ্বে প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী জীবনে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়। মেয়েদের মতোই ছেলেগুলোর মধ্যেও সহিংস আচরণের শিকড় থাকে, যা মূলত পুরুষত্বকে শক্তি, অধিকারের প্রতীক হিসেবে দেখার ভুল মানসিকতার ফল। এজন্য যুবকদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক ও সম্মান সম্বন্ধে কথা বলা অপরিহার্য।

শুধু রাগ যথেষ্ট নয়, কার্যকর সমাধান দরকার
সার্বজনীন ক্রোধ যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গঠনে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। মূল সমস্যা হল ক্ষমতার অপব্যবহার, নীরবতা ও কাঠামোগত বৈষম্য। এই সবকিছু মোকাবিলা করার জন্য শুধু অপরাধীর নাম ঘোষণা করা যথেষ্ট নয়; সমাজের প্রত্যেক স্তরে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এদিকে প্রতিষ্ঠিত গবেষণায় দেখা গেছে কার্যকর শিক্ষা, নীতি ও বাধ্যতামূলক প্রতিক্রিয়া সহিংসতা কমাতে সহায়তা করে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্মান, সমতা ও সম্মতির পাঠ্য অন্তর্ভুক্ত করলে সহিংসতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থাকে মৌলিক সমস্যা হিসেবে নেয়া হলে তা সমাজের আচরণ ও মনোভাব পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
সমাজ এমন বিশ্ব তৈরি করতে পারে যেখানে সহিংসতা আর ‘ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি’ হিসেবে দেখা হবে না; বরং এটি একটি সাংঘাতিক সামাজিক ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। এখনই সময় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ ‘এপস্টেইনের মতো’ ক্ষমতাধর ব্যক্তি তাদের অপকর্ম চালিয়ে যেতে না পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















