লন্ডনের ওয়র্মউড স্ক্রাবস কারাগারের চারপাশে ভোরের নীরবতা ভেঙে এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল স্থানীয়রা। রাত প্রায় তিনটার দিকে একটি সেডান গাড়ি আবাসিক রাস্তায় থামল। গাড়ি থেকে একজন মানুষ নেমে মাটিতে একটি ছোটো বস্তুর দিকে নজর দিলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বস্তুটি উড়ে গেল আকাশে। এটি ছিল এক ড্রোন, যা কারাগারের ভিতরে বন্দীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিষিদ্ধ জিনিসপত্র বহন করছিল।
ড্রোনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ সামগ্রী পরিবহণের কৌশল
ড্রোন চালক ছিলেন শফাগহাতুল্লাহ মোহসেনি, বয়স ২৯ বছর। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোহসেনি একটি দলের নেতৃত্বে প্রায় একশো চল্লিশটিরও বেশি ড্রোন ফ্লাইট পরিচালনা করেন। এই ফ্লাইটগুলিতে বন্দীদের বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে অর্ডার করা ফোন, চার্জার, ধূমপান সামগ্রী, ছুরি ও অন্যান্য নিষিদ্ধ জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়া হতো। মামলার শুনানিতে জানা যায়, বন্দীরা প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য প্রায় ২৭ হাজার পাউন্ড অর্থ প্রদান করেছিল।
কারাগারে নিরাপত্তা হুমকি বাড়ছে
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ড্রোনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ জিনিসপত্র প্রবেশ করানোই কারাগারের ভিতরে সহিংসতা এবং মাদকদ্রব্য ব্যবহারের হার বাড়াচ্ছে। বন্দীরা এখন মোবাইল ফোন, মাদক, এমনকি শরীরচর্চার ইনজেকশনও অর্ডার করছে। কারাগারের গভর্নর্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জানান, “কারাগারের ভিতরে যা কিছু মূল্যবান, যা বন্দীরা চায় কিন্তু নিয়মমাফিক পাওয়া সম্ভব নয়, সবই ড্রোনের মাধ্যমে আনা হচ্ছে।”
আদালতের মন্তব্য
ড্রোন চালানো এসব প্যাকেজ জেলখানার ভিতরে পৌঁছানোর ঘটনা আদালতে “উবার ইটসের মতো” সহজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জাজ জেমস লফথাউস মোহসেনিকে পাঁচ বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বিভিন্ন কারাগারে ড্রোনের উপস্থিতি ২০১৪ সাল থেকে ক্রমশ বেড়ে ২০২৫ সালের মার্চে রেকর্ড ১,৭১২টি ঘটনা লক্ষ্য করা যায়।
ড্রোনের আগমনের আগে কৌশল ও বর্তমান বিপদ
পূর্বে জেলখানায় নিষিদ্ধ জিনিসপত্র পৌঁছে দিতে অন্য কৌশল ব্যবহার হতো। কেউ বা ড্রাগ ভর্তি মৃত কবুতর ছুঁড়ে দিত বা টেনিস বলের ভিতরে মাদক ভর্তি করে জানালা থেকে উপরে ছুঁড়ে পাঠানো হতো। কিন্তু এখন ড্রোন এত সহজলভ্য ও কার্যকর যে এটি সবচেয়ে সাধারণ পন্থা হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ কারাগারের পুরোনো ভবনগুলো মূলত স্থল থেকে নিরাপদ, আকাশ থেকে নয়। তাই ড্রোনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ সামগ্রী প্রবেশের সম্ভাবনা খুব বেশি।
![]()
সমাজ ও পরিবারে প্রভাব
এই অবৈধ কার্যক্রম শুধু কারাগারের ভিতরে সীমাবদ্ধ নেই, বাইরের সমাজকেও প্রভাবিত করছে। অনেক সময় বন্দীর পরিবার ও বন্ধুদের উপর চাপ সৃষ্টি হয়, দেনা পরিশোধের জন্য। জাতীয় নিরীক্ষা অফিসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ড্রোনের মাধ্যমে আসা নিষিদ্ধ জিনিসপত্র কারাগারে ড্রাগ ব্যবহারের হার বাড়াচ্ছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি প্রয়োগ
কারাগারের উপর নেটিং লাগানো হচ্ছে এবং জানালা-ঘেরায় গ্রিল বসানো হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি এমন প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন প্রদানের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, যা নিরাপত্তা সীমা অতিক্রমকারী ড্রোনকে রোধ করবে। তবে একবার ড্রোন আকাশে উঠলে নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে তা আটকানো কঠিন। তাই অপরাধীদের ঘরেই গিয়ে ড্রোন চালককে ধরে ফেলা ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















