ইরানকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান কয়েক দিনের ব্যবধানে নাটকীয়ভাবে বদলে যাওয়ায় ওয়াশিংটনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে তিনি ইরানকে কঠোর হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে পরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এই পুরো সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান নেতৃত্ব, প্রায় নীরব থেকেছে।
কংগ্রেস ছুটিতে, সিদ্ধান্তের বাইরে আইনপ্রণেতারা
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ ঘোষণা ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের সাংবিধানিক ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে থাকলেও, ইরানকে ঘিরে দ্রুত বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে আইনপ্রণেতাদের বড় অংশ কার্যত অন্ধকারে ছিল। কংগ্রেস তখন ছুটিতে, আর ওয়াশিংটনের নিরাপদ পরিবেশের বাইরে ছড়িয়ে থাকা সদস্যরা প্রশাসনের কাছ থেকে সামরিক অভিযান বা কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে নিয়মিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংও পাননি।
রিপাবলিকান নেতৃত্বের নীরবতা
প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন যুদ্ধবিরতির ঘোষণাটি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করলেও নিজের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো মন্তব্য করেননি। সিনেটে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুনও প্রকাশ্যে কোনো বিবৃতি দেননি। প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ব্রায়ান মাস্টও ইরান ইস্যুতে কিছু না বলে অন্য বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে, দলের শীর্ষ নেতারা এ ইস্যুতে সরাসরি অবস্থান নিতে অনীহা দেখিয়েছেন।

কেন নীরব রিপাবলিকানরা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে রিপাবলিকানরা বড়-ছোট নানা বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে নিজেদের ক্ষমতা ও ভূমিকার একটি অংশ ছেড়ে দিয়েছে। ইরান প্রশ্নে তাদের এই নীরবতা শুধু প্রেসিডেন্টকে অস্বস্তিকর বিতর্ক থেকে রক্ষা করেনি, বরং দলীয় ভেতরের বিভক্তিও আড়াল করেছে। কারণ রিপাবলিকান শিবিরের একাংশ মনে করছে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক সংঘাতে টেনে নিচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা চাপ
ডেমোক্র্যাটরা এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরও জোরালো অবস্থান নিয়েছে। সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার জানিয়েছেন, কংগ্রেস অধিবেশনে ফিরলে তারা আবারও ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটের উদ্যোগ নেবেন। তার ভাষায়, এমন বিপজ্জনক সময়ে কংগ্রেসকে নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা আবার দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিজ বলেছেন, যুদ্ধ ঠেকাতে আবার ভোট আনার চেষ্টা হবে এবং কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যকে পাশে পাওয়ার সম্ভাবনাও তিনি দেখছেন।
কিছু রিপাবলিকানের সতর্ক সমর্থন
রিপাবলিকানদের মধ্যে যারা মুখ খুলেছেন, তাদের বক্তব্যে দুই ধরনের সুর দেখা গেছে। কেউ ট্রাম্পের কৌশলকে সরাসরি সমর্থন করেছেন, কেউ আবার কংগ্রেসের নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধান হলে তিনি তা সমর্থন করেন, তবে যেকোনো শান্তিচুক্তি জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য পূরণ করছে কি না, তা কংগ্রেসকে ব্যাখ্যা করতে হবে। অন্যদিকে সিনেটর জন কর্নিন ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।

পূর্ণ ভরসা ট্রাম্পের ওপর
উইসকনসিনের রিপাবলিকান সিনেটর রন জনসন বলেছেন, তিনি এখনও পুরো বিষয়টি সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতি জটিল ও বিপজ্জনক। তার মতে, সংঘাতের এই বিরতি ব্যবহার করে আরও নির্দিষ্ট ফলাফলের দিকে যেতে হবে। তিনি এমনও বলেছেন যে, শুধু সীমিত যুদ্ধলক্ষ্য পূরণ করাই যথেষ্ট নয়; আরও বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, রিপাবলিকানদের একাংশ প্রকাশ্যে প্রশ্ন না তুললেও আরও কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে থাকতে পারে।
প্রশাসনঘনিষ্ঠ শিবিরের বক্তব্য
প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র বাহিনী কমিটির চেয়ারম্যান মাইক ডি. রজার্স বলেছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্ব এবং মার্কিন বাহিনীর পদক্ষেপ ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। ফ্লোরিডার প্রতিনিধি আনা পওলিনা লুনাও বলেছেন, শুরু থেকেই ট্রাম্পের বার্তা ছিল স্পষ্ট ও হিসাবমতো। তার দাবি, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল মার্কিন প্রাণ বাঁচানো।

মূল সংকট কোথায়
এই ঘটনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে এত বড় সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের ভূমিকা কোথায়। ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের বারবার বদলে যাওয়া অবস্থান, যুদ্ধবিরতির অনিশ্চয়তা, আর কংগ্রেসের নিষ্ক্রিয়তা—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্য নিয়েই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে দেশকে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের বড় অংশ এখনো প্রকাশ্যে তার বিরোধিতায় যেতে চাইছে না।
এখন নজর পরবর্তী ভোটে
কংগ্রেস অধিবেশনে ফিরলে ইরান ইস্যুতে নতুন করে যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপিত হতে পারে। তখন বোঝা যাবে, রিপাবলিকানদের নীরবতার ভেতরে আসলে কতটা অস্বস্তি জমে আছে, আর ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ানোর রাজনৈতিক সীমা কোথায় গিয়ে থামে। আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, তা হলো—প্রেসিডেন্টের অবস্থান বদলাচ্ছে দ্রুত, কিন্তু কংগ্রেস এখনো তার সমান্তরালে চলতে পারছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















