মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করায় সম্পদ, বাণিজ্যপথ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উত্তেজনা দ্রুত বেড়েছে, যা বিশ্বের প্রান্তে আধিপত্য বিস্তারের পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আবারও জাগিয়ে তুলছে।
উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ার মুরমানস্ক বন্দরে একটি টাইফুন-শ্রেণির সাবমেরিন ভিড় করা অবস্থায় দেখা যায়।
এই হুমকির মোকাবিলায় ন্যাটো উত্তরাঞ্চলে তাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান জোরদার করছে।
আর্কটিক অঞ্চল এখন আর শান্ত নেই; এটি ধীরে ধীরে তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে যাওয়ায় নতুন সমুদ্রপথ খুলে যাচ্ছে এবং গ্রিনল্যান্ডের মতো এলাকায় বিরল খনিজ সম্পদের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
রাশিয়া, যার আর্কটিক উপকূল সবচেয়ে দীর্ঘ, দ্রুত সামরিকীকরণ বাড়াচ্ছে। তারা তাদের নর্দান ফ্লিট আধুনিক করছে, সোভিয়েত যুগের ঘাঁটিগুলো পুনরায় চালু করছে এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে নতুন নর্দার্ন সি রুটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

অন্যদিকে চীন ‘পোলার সিল্ক রোড’ উদ্যোগের মাধ্যমে আর্কটিকে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। গবেষণা, অবকাঠামো ও যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে তারা রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করছে, যা পশ্চিমা নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় ন্যাটো উত্তরাঞ্চলে তাদের প্রতিরক্ষা জোরদার করছে। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন যুক্ত হওয়ার পর আটটি আর্কটিক কাউন্সিল সদস্যের মধ্যে সাতটিই এখন ন্যাটোর অংশ। তারা সমুদ্রপথের স্বাধীনতা রক্ষা, সাবমেরিন যুদ্ধ এবং নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই অঞ্চল পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সমুদ্রতলের যোগাযোগ ব্যবস্থা, যেমন কেবল, রক্ষা করাও এখন বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। এখানে অর্থনীতি, পরিবেশ এবং নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে জড়িয়ে একটি কৌশলগত ত্রিভুজ তৈরি করেছে।
তবে আর্কটিকের এই গুরুত্ব নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই পথ দিয়ে সরবরাহ পাঠানো হতো। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় এটি সাবমেরিন কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বরফের নিচে সাবমেরিন চালানো সম্ভব হয় এবং ন্যাটো ও সোভিয়েত নৌবাহিনীর মধ্যে এক ধরনের ‘লুকোচুরি’ প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাবমেরিন কৌশলে পরিবর্তন আসে। আগে যেখানে তাদের কাজ ছিল পৃষ্ঠের জাহাজ ডুবানো, পরে তাদের প্রধান লক্ষ্য হয় শত্রুপক্ষের সাবমেরিন ধ্বংস করা।

১৯৪৮ সালে এই সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। ব্রিটিশ সাবমেরিন এইচএমএস অ্যাম্বুশ আর্কটিকে পরীক্ষা চালায়। ১৯৪৯ সালে মার্কিন নৌবাহিনী ইউএসএস কোকিনো ও ইউএসএস টাস্ক সাবমেরিন বারেন্টস সাগরে পাঠায় সোভিয়েত পারমাণবিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য। এসব অভিযান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ—কোকিনো একটি বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়।
১৯৫০-এর দশকে ব্রিটিশ সাবমেরিনগুলো আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করে। ১৯৫৫ সালে এইচএমএস টোটেম প্রথম গোপন নজরদারি মিশন শুরু করে, যা প্রায় ৩৫ বছর ধরে চলতে থাকে।
১৯৫৮ সালে এইচএমএস অ্যাল্ডারনি প্রথমবারের মতো আর্কটিক বরফের নিচে ডুব দেয়। এর এক মাস পর পারমাণবিক শক্তিচালিত ইউএসএস নটিলাস বরফের নিচ দিয়ে উত্তর মেরুতে পৌঁছে ইতিহাস গড়ে। এটি প্রমাণ করে যে পারমাণবিক সাবমেরিন প্রায় অনির্দিষ্টকাল পানির নিচে থাকতে পারে।
১৯৫৯ সালে ইউএসএস স্কেট উত্তর মেরুতে ভেসে ওঠে এবং ১৯৬২ সালে সোভিয়েত সাবমেরিন লেনিনস্কি কমসোমল একই কাজ করে।
তবে বরফের নিচে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে ডিজেলচালিত সাবমেরিনের জন্য। বরফের নিচে অসমান গঠন, পানির শব্দের অস্বাভাবিক আচরণ এবং অদৃশ্য বরফখণ্ডের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল।
![]()
১৯৭১ সালে ব্রিটেনের প্রথম পারমাণবিক সাবমেরিন এইচএমএস ড্রেডনট উত্তর মেরুর কাছাকাছি বরফ ভেদ করে উঠে আসে, যা তাদের সক্ষমতার বড় প্রমাণ ছিল।
১৯৭০-এর দশকে ব্রিটিশ, মার্কিন ও কানাডিয়ান বাহিনী যৌথভাবে আর্কটিকে অভিযান চালায়। তখন ধারণা করা হচ্ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন বরফের নিচে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন লুকিয়ে রাখছে।
১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত নর্দান ফ্লিটে ৩৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন ছিল, যা আর্কটিকের সুরক্ষিত পানি থেকে আক্রমণ চালাতে সক্ষম ছিল।
ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ব্রিটিশ সাবমেরিন কার্যক্রম মাঝে মাঝে চলেছে। ২০০৭ সালে একটি দুর্ঘটনার পর কিছুদিন বিরতি আসে। ২০১৮ সালে আবার আর্কটিক অভিযানে ফিরে যায় এইচএমএস ট্রেনচ্যান্ট।
বর্তমান ব্রিটিশ সাবমেরিনগুলো আগের মতো শক্তিশালী বরফ ভেদ করার সক্ষমতা না থাকায় তাদের কার্যক্রম কিছুটা সীমিত হয়ে পড়েছে।
ড. পল ব্রাউন 



















