০৪:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
নেপালে মাউন্ট এভারেস্টে ২ কোটি ডলারের বিমা কেলেঙ্কারি: ৩৩ জন অভিযুক্ত, পর্যটকদের অসুস্থ করে ভুয়া উদ্ধার দাবি লেবাননের দক্ষিণে ইসরায়েলি হামলায় ৪ নিহত, বিন্ত জুবাইলের প্রবেশপথ দখলে ইসরায়েলি সেনা পোপ লিওকে ‘দুর্বল’ বললেন ট্রাম্প, ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিরল সংঘাত মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের বন্দর অবরোধ শুরু করেছে, তেলের দাম ফের ১০০ ডলার ছাড়াল আইসিটি-২ তে সাবেক মন্ত্রী হাসান মাহমুদসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গৃহীত ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় গালফে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবিকা সংকটে, রেমিট্যান্স প্রবাহে শঙ্কা মমতা বনাম শুভেন্দু: পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আবারও মুখোমুখি প্রাক্তন মিত্র, জমে উঠেছে ‘রাউন্ড টু’ চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ইটভাটার মাটি খোঁড়া গর্তে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু অ্যাম্বুলেন্সের চাবি কেড়ে নিল সিন্ডিকেট, শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত নবজাতকের মৃত্যু শরীয়তপুরে দিল্লি বিধানসভায় বোমা হামলার হুমকি, তামিলনাড়ু ভোট রাজনীতিরও উল্লেখ

এলএনজি দাম ১৪৩% বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়ে চাপে বাংলাদেশ: জ্বালানি সংকটে বাড়ছে বৈশ্বিক ঝুঁকি

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের এই সময়ে এলএনজি দামে ১৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলেছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশকেও এ সময়ে এলএনজি আমদানি বাড়াতে গিয়ে বেশি খরচ বহন করতে হয়েছে। ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের পর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কা। এখন শুধু জ্বালানির দাম নয়, পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোই চাপের মুখে।

মূল্য সংকটের বাইরে বিস্তৃত ঝুঁকি

এ সংকট কেবল জ্বালানির দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে ঋণবাজার, বীমা খাত এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ভারসাম্যে। ফলে ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতি একটি বড় আর্থিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে। সরকারগুলো একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে লড়ছে, অন্যদিকে শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

তেল, গ্যাস ও কয়লার পারস্পরিক নির্ভরতা

তেল, গ্যাস ও কয়লা দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একটি খাতে সংকট দেখা দিলে অন্যটি সাময়িকভাবে সেই ঘাটতি পূরণ করে। কিন্তু বাস্তবে এই তিনটি জ্বালানিই একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সীমিত সরবরাহকারী, দীর্ঘ সরবরাহ চেইন এবং জটিল বাণিজ্য ব্যবস্থার কারণে একটিতে ধাক্কা লাগলে অন্যগুলিও দ্রুত প্রভাবিত হয়। ফলে স্বল্পমেয়াদে লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি থেকেই যায়।

Oil gas coal vector energy and resources icons fossil fuel symbols |  Premium Vector

এলএনজি ও কয়লার অস্থিরতা

তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি একসময় নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন তা তেলের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় এর দাম ১৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, বিশেষ করে এশিয়ায়, যেখানে আমদানিনির্ভরতা বেশি।

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যখন ইউরোপের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এলএনজি দামে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়।

কয়লার ক্ষেত্রেও অস্থিরতা কম নয়। ২০২০ সালে মহামারির সময় কয়লার দাম নেমে গিয়েছিল খুব নিচে, পরে ২০২২ সালে তা হঠাৎ বেড়ে যায়। আবার ২০২৩ সালে চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম কমে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে এটি আবার নিম্নমুখী ছিল, যা বাজারের অস্থিরতাকেই তুলে ধরে।

ব্যাংকিং খাতে প্রভাব

জ্বালানির এই দামের ওঠানামা ব্যাংকিং খাতেও প্রভাব ফেলছে। খনিশিল্পে ঋণ বেশি থাকায় কয়লার দামের পতনে ঋণ খেলাপির ঝুঁকি বাড়ে। এতে আর্থিক খাতে চাপ তৈরি হয় এবং একটি নেতিবাচক চক্র সৃষ্টি হয়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক

এলএনজি টার্মিনালে ফের ত্রুটি, গ্যাস সংকট বাড়ছে

এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে পরিষ্কার জ্বালানিতে বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। বড় ব্যাংকগুলোও এখন এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, কারণ এটি লাভজনক ও দ্রুত বর্ধনশীল।

দেশভেদে প্রভাবের পার্থক্য

যেসব দেশ আগে থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করেছে, তারা তুলনামূলকভাবে এই সংকটে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন, সৌরশক্তির প্রসারে কিছু দেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি বাড়াতে গিয়ে বেশি ব্যয় করতে হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সীমাবদ্ধতা

যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিয়োগ ব্যয় বাড়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তবে এই সমস্যাগুলো জ্বালানির নিজস্ব নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে।

নীতিগত চ্যালেঞ্জ ও সমাধান

অনেক দেশে এখনো নীতিগত দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। একদিকে পরিষ্কার জ্বালানির পরিকল্পনা, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়ানো—এই দ্বৈত নীতি সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।

CEA Recommends Measures for EV-to-Grid Charging

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়লা স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা দিতে পারে না। এর পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোই টেকসই সমাধান।

এ জন্য বিদ্যুৎ গ্রিড উন্নয়ন, বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার এবং চার্জিং অবকাঠামো তৈরি জরুরি। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

উপসংহার

বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে যে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি। এখন সময় এসেছে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালে মাউন্ট এভারেস্টে ২ কোটি ডলারের বিমা কেলেঙ্কারি: ৩৩ জন অভিযুক্ত, পর্যটকদের অসুস্থ করে ভুয়া উদ্ধার দাবি

এলএনজি দাম ১৪৩% বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়ে চাপে বাংলাদেশ: জ্বালানি সংকটে বাড়ছে বৈশ্বিক ঝুঁকি

০২:৪১:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের এই সময়ে এলএনজি দামে ১৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলেছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশকেও এ সময়ে এলএনজি আমদানি বাড়াতে গিয়ে বেশি খরচ বহন করতে হয়েছে। ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের পর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কা। এখন শুধু জ্বালানির দাম নয়, পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোই চাপের মুখে।

মূল্য সংকটের বাইরে বিস্তৃত ঝুঁকি

এ সংকট কেবল জ্বালানির দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে ঋণবাজার, বীমা খাত এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ভারসাম্যে। ফলে ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতি একটি বড় আর্থিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে। সরকারগুলো একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে লড়ছে, অন্যদিকে শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

তেল, গ্যাস ও কয়লার পারস্পরিক নির্ভরতা

তেল, গ্যাস ও কয়লা দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একটি খাতে সংকট দেখা দিলে অন্যটি সাময়িকভাবে সেই ঘাটতি পূরণ করে। কিন্তু বাস্তবে এই তিনটি জ্বালানিই একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সীমিত সরবরাহকারী, দীর্ঘ সরবরাহ চেইন এবং জটিল বাণিজ্য ব্যবস্থার কারণে একটিতে ধাক্কা লাগলে অন্যগুলিও দ্রুত প্রভাবিত হয়। ফলে স্বল্পমেয়াদে লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি থেকেই যায়।

Oil gas coal vector energy and resources icons fossil fuel symbols |  Premium Vector

এলএনজি ও কয়লার অস্থিরতা

তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি একসময় নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন তা তেলের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় এর দাম ১৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, বিশেষ করে এশিয়ায়, যেখানে আমদানিনির্ভরতা বেশি।

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যখন ইউরোপের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এলএনজি দামে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়।

কয়লার ক্ষেত্রেও অস্থিরতা কম নয়। ২০২০ সালে মহামারির সময় কয়লার দাম নেমে গিয়েছিল খুব নিচে, পরে ২০২২ সালে তা হঠাৎ বেড়ে যায়। আবার ২০২৩ সালে চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম কমে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে এটি আবার নিম্নমুখী ছিল, যা বাজারের অস্থিরতাকেই তুলে ধরে।

ব্যাংকিং খাতে প্রভাব

জ্বালানির এই দামের ওঠানামা ব্যাংকিং খাতেও প্রভাব ফেলছে। খনিশিল্পে ঋণ বেশি থাকায় কয়লার দামের পতনে ঋণ খেলাপির ঝুঁকি বাড়ে। এতে আর্থিক খাতে চাপ তৈরি হয় এবং একটি নেতিবাচক চক্র সৃষ্টি হয়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক

এলএনজি টার্মিনালে ফের ত্রুটি, গ্যাস সংকট বাড়ছে

এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে পরিষ্কার জ্বালানিতে বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। বড় ব্যাংকগুলোও এখন এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, কারণ এটি লাভজনক ও দ্রুত বর্ধনশীল।

দেশভেদে প্রভাবের পার্থক্য

যেসব দেশ আগে থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করেছে, তারা তুলনামূলকভাবে এই সংকটে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন, সৌরশক্তির প্রসারে কিছু দেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি বাড়াতে গিয়ে বেশি ব্যয় করতে হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সীমাবদ্ধতা

যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিয়োগ ব্যয় বাড়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তবে এই সমস্যাগুলো জ্বালানির নিজস্ব নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে।

নীতিগত চ্যালেঞ্জ ও সমাধান

অনেক দেশে এখনো নীতিগত দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। একদিকে পরিষ্কার জ্বালানির পরিকল্পনা, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়ানো—এই দ্বৈত নীতি সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।

CEA Recommends Measures for EV-to-Grid Charging

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়লা স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা দিতে পারে না। এর পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোই টেকসই সমাধান।

এ জন্য বিদ্যুৎ গ্রিড উন্নয়ন, বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার এবং চার্জিং অবকাঠামো তৈরি জরুরি। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

উপসংহার

বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে যে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি। এখন সময় এসেছে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার।