পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বলতে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা প্রথমেই সামনে আসে, তা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর দ্বৈরথ। একসময় একই দলের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ছিলেন তারা, আর এখন সেই সম্পর্ক রূপ নিয়েছে রাজ্যের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক লড়াইয়ে।
সম্পর্ক থেকে সংঘাতে রূপান্তর
তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে মেন্টর-প্রোটেজে সম্পর্ক হিসেবে শুরু হয়েছিল এই রাজনৈতিক যাত্রা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্ক ভেঙে গিয়ে পরিণত হয় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ২০২০ সালে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপিতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পায়।
নন্দীগ্রাম: রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের কেন্দ্র
এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নন্দীগ্রাম। ২০০৭ সালে ভূমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনে শুভেন্দু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং মমতার অন্যতম বিশ্বস্ত সংগঠক হিসেবে উঠে আসেন।
এই আন্দোলনের ফলেই ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে, দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে।
পরবর্তী সময়ে শুভেন্দু দ্রুত দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন এবং গ্রামীণ সংগঠনে তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

সম্পর্কের ভাঙন ও দলবদল
২০১৯ সালের পর থেকে দলের ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও উপেক্ষার অভিযোগে এই সম্পর্কের ফাটল স্পষ্ট হতে শুরু করে। অবশেষে ২০২০ সালে শুভেন্দুর বিজেপিতে যোগ দেওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দেয়।
২০২১: মুখোমুখি লড়াইয়ের প্রথম অধ্যায়
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন ছিল এই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত প্রকাশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই নন্দীগ্রাম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যা ছিল শুভেন্দুর শক্ত ঘাঁটি।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের শেষে শুভেন্দু সামান্য ব্যবধানে জয়ী হন। যদিও তৃণমূল সামগ্রিকভাবে সরকার গঠন করে, কিন্তু এই পরাজয় রাজনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা ছিল মমতার জন্য।
এর ফলে মমতাকে কিছু সময়ের জন্য বিধানসভার বাইরে থাকতে হয়, পরে ভবানীপুর উপনির্বাচনে জিতে তিনি ফিরে আসেন।
নতুন উত্তেজনা ও অভিযোগ

পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ভোট জালিয়াতির মতো বিভিন্ন ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ চলতে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভবানীপুর কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসারকে নিয়ে তৃণমূল পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে, যা এই দ্বন্দ্বকে আরও উসকে দিয়েছে।
২০২৬ নির্বাচন: ভবানীপুরে দ্বিতীয় পর্ব
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি মমতার বর্তমান কেন্দ্র ভবানীপুরে লড়াইয়ে নেমেছেন, পাশাপাশি নন্দীগ্রাম থেকেও প্রার্থী হয়েছেন।
ভোটগ্রহণ হবে দুই দফায়—২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল, আর গণনা ৪ মে।
প্রচারে কৌশলগত অবস্থান
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে রাজ্যের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরছেন এবং বাইরের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে প্রচার চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারী ২০২১ সালের জয়ের উদাহরণ দিয়ে পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন এবং মমতার দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছেন।

উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে সেই পুরনো সম্পর্কের দিকে—একজন নেতা ও তার সাবেক সহযোদ্ধা, যারা এখন মুখোমুখি লড়াইয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চলেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















