বাংলাদেশের নতুন বাজেটকে ঘিরে সরকারের ভাষ্য আশাবাদী। মূল্যস্ফীতি কমানো, কর-জাল বাড়ানো, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, আর স্বাস্থ্য-শিক্ষায় বেশি ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে সরকার একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির কথা বলছে। অর্থমন্ত্রী এই বাজেটকে প্রবৃদ্ধিনির্ভর চিন্তা থেকে সরে এসে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতির দিকে মোড় নেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব সংকট কাটাতে কতটা কার্যকর হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, বাংলাদেশের সামনে সুযোগ আছে ঠিকই, তবে কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে দ্রুত ও কঠোর সংস্কার দরকার।
সরকারের বাজেট ভাবনা: ভারসাম্যের পথে নতুন অঙ্গীকার
অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৬ শতাংশে নামানো, কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে তোলা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহায়তা এবং সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বদলে পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নে জোর দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এতে বোঝা যায়, সরকার অর্থনীতির ভিত্তিগত সমস্যাগুলো ধরতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়।

আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন: সতর্ক সংকেত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনো স্বস্তির পর্যায়ে নামেনি। প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে কমে ২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় দুর্বল এবং অর্থনীতিতে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকও একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশ এখন ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং কম বিনিয়োগের এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আছে। ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩.৯ শতাংশ হতে পারে বলে তারা ধারণা করছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাসও খুব ভিন্ন নয়। তারা বলছে, প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের আশেপাশে থাকতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। অর্থাৎ সরকার যে দ্রুত স্বস্তির লক্ষ্য দেখাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস তাৎক্ষণিকভাবে সেটাকে সমর্থন করছে না।
মূল চাপের জায়গাগুলো
সবচেয়ে বড় চাপ মূল্যস্ফীতি। সরকার এটি ৫ থেকে ৬ শতাংশে নামাতে চাইলেও বাস্তবে তা এখনো অনেক বেশি। খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে এবং প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বড় সমস্যা ব্যাংক খাত। অনাদায়ী ঋণের হার বেড়েছে, ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। ফলে বিনিয়োগও স্থবির হয়ে আছে।
তৃতীয় চাপ রাজস্ব খাতে। কর-জিডিপি অনুপাত এখনো খুব কম। ফলে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
চতুর্থ চাপ কর্মসংস্থান। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত চাকরি না হওয়ায় অনেক তরুণ কৃষিতে চলে যাচ্ছে, ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং আড়াল-থাকা বেকারত্ব বাড়ছে।
বাজেটের সামনে বাস্তব পরীক্ষা
এই পরিস্থিতিতে বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, কর-ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো—এই চারটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি দরকার।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে এবং সংস্কার দ্রুত এগোলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে দেরি হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে।
শেষ কথা
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন শক্ত বাস্তবায়ন, ধারাবাহিক নীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং আস্থা ও সক্ষমতার বড় পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















