সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব রাজনীতিতে যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে রাশিয়ার ওপর। একসময় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়া সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর নতুন রাশিয়া অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবহীনতার মুখে পড়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুর্বল অবস্থাকে পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে শুরু করে মস্কো। আর এই পুনরুত্থানের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে আফ্রিকা মহাদেশ।
সোভিয়েত যুগের উত্তরাধিকার ও আফ্রিকায় প্রভাবের শুরু
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আফ্রিকায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তার শুরু হয়। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনগুলোকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করে। যদিও আদর্শগতভাবে সমাজতন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা খুব বেশি সফল হয়নি, তবুও অস্ত্র সরবরাহ ছিল তাদের অন্যতম কার্যকর কৌশল।
বিশেষ করে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফ্রিকার সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে উঠে আসে। তবে এই সম্পর্কগুলো ছিল মূলত প্রয়োজনভিত্তিক, স্থায়ী রাজনৈতিক জোট নয়। ফলে সোভিয়েত শক্তি দুর্বল হতে শুরু করলে এই সম্পর্কও দ্রুত ভেঙে পড়ে।
পতনের পর পিছু হটা ও সংকটকাল
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর নবগঠিত রাশিয়া চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। সেই সময় প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন আফ্রিকা থেকে রাশিয়ার উপস্থিতি অনেকটাই গুটিয়ে নেন।
অনেক দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়, অস্ত্র রপ্তানি কমে যায় এবং আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়ে। শুধুমাত্র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ—যেমন অ্যাঙ্গোলা, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সীমিত সম্পর্ক বজায় রাখা হয়।
এই সময়টিতে রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি ছিল বাস্তববাদী, যেখানে আদর্শের চেয়ে অর্থনৈতিক টিকে থাকা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে আফ্রিকায় প্রত্যাবর্তন
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে রাশিয়ার নীতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভগেনি প্রিমাকভ আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার পক্ষে জোর দেন।
তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সমন্বয়ের বদলে আলাদা কৌশল গ্রহণের কথা বলেন এবং আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
এই সময়ে রাশিয়া পুরনো ঋণ মওকুফ করে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় চালু করে এবং বিশেষ করে অস্ত্র বিক্রিকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রভাব বিস্তার শুরু করে।

অস্ত্র ব্যবসায়ী ও ছায়া নেটওয়ার্কের উত্থান
সোভিয়েত পতনের পর বিশাল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একদল ব্যক্তিগত অস্ত্র ব্যবসায়ী উঠে আসে, যারা আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাতে এসব অস্ত্র সরবরাহ করতে থাকে।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল ভিক্টর বাউট। সাবেক সোভিয়েত সেনা কর্মকর্তা বাউট দ্রুতই একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং আফ্রিকার যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র সরবরাহের অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠেন।
তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে বিমানযোগে অস্ত্র পৌঁছে দিতেন এবং বিপুল অর্থ উপার্জন করেন, যার বড় অংশ আসত নগদ অর্থ ও হীরার মাধ্যমে।
পুতিন যুগে সংগঠিত কৌশল
২০০০ সালে ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় আসার পর আফ্রিকায় রাশিয়ার কৌশল আরও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে অস্ত্র বিক্রি বাড়ানো হয়।
এই সময় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বড় বড় চুক্তি হয়, যেখানে যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়।
ইথিওপিয়া, আলজেরিয়া, লিবিয়া এবং সুদানসহ অনেক দেশ রাশিয়ার প্রধান ক্রেতা হয়ে ওঠে।

বড় চুক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব
আলজেরিয়ার সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি, লিবিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা এবং সুদানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক—এসবই রাশিয়ার আফ্রিকায় পুনরুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক লাভই হয়নি, বরং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও রাশিয়ার প্রভাব বাড়তে থাকে।
একই সঙ্গে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে রাশিয়া নিজেদের স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থানও প্রতিষ্ঠা করে।
বেসরকারি সামরিক গোষ্ঠীর উত্থান
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া তাদের কৌশলে আরও পরিবর্তন আনে। সরাসরি রাষ্ট্রীয় উপস্থিতির পাশাপাশি বেসরকারি সামরিক গোষ্ঠী ব্যবহার শুরু হয়।
এই গোষ্ঠীগুলো আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করে। এর মাধ্যমে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে না জড়িয়েও নিজের প্রভাব বজায় রাখতে পারে।

২০১৫ সালের পর থেকে এই গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয় এবং আজও তা অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতা ও বৈশ্বিক প্রভাব
বর্তমানে আফ্রিকায় রাশিয়ার উপস্থিতি একটি বহুমাত্রিক কৌশলের অংশ। এটি শুধু অস্ত্র বাণিজ্য নয়, বরং অর্থনীতি, রাজনীতি এবং নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে একটি শক্তিশালী প্রভাবের নেটওয়ার্ক।
আফ্রিকার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলো রাশিয়ার জন্য একদিকে যেমন বাজার, অন্যদিকে তেমনি কৌশলগত অবস্থান শক্ত করার সুযোগ।
এই পুরো প্রক্রিয়া দেখায়, কীভাবে একটি রাষ্ট্র দুর্বল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে পুনরায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। আর সেই পুনরুত্থানের পেছনে যদি থাকে সুপরিকল্পিত কৌশল ও আন্তর্জাতিক সুযোগের সদ্ব্যবহার, তবে তার প্রভাব বিশ্ব রাজনীতিতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















