“এটি দারুণ একটি বিষয়,” সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এমন মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইরানের সঙ্গে যৌথভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ধারণা নিয়ে ভাবছেন বলে জানান। একই দিনে সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, এখানে “বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জন সম্ভব”, কারণ জাহাজ চলাচলে চাপ বাড়ছে।
এই মন্তব্যগুলো কেবল চমকপ্রদ নয়—এগুলো একটি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। এতে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে আর একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে নয়, বরং একটি লেনদেনভিত্তিক অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতাকে কখনোই বিক্রির পণ্য হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটি একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে রক্ষা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিকের সামরিক সংঘর্ষগুলোর একটি—ফ্রান্সের সঙ্গে আধা-যুদ্ধ—আংশিকভাবে ছিল বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার প্রতিক্রিয়া। এরপর বার্বারি জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই নীতি প্রতিষ্ঠা করে যে, সমুদ্রপথে বাণিজ্য অবাধ থাকতে হবে।

সময়ের সঙ্গে এই অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী হয়েছে। আধুনিক যুগে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথগুলো—যেমন হরমুজ প্রণালী বা মালাক্কা প্রণালী—খোলা রাখার জন্য টহল দিয়েছে। এটি করেছে বিপুল ব্যয়ে, কিন্তু কোনো মাশুল আদায়ের জন্য নয়, বরং একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য। উন্মুক্ত সমুদ্রপথই উন্মুক্ত বাণিজ্যের ভিত্তি, যা আবার উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত শান্তি নিশ্চিত করে।
কিন্তু ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি এই ঐতিহ্যের বিপরীত। তার কাছে হরমুজ প্রণালী কোনো বৈশ্বিক সম্পদ নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক সম্পদ। কেন একটি জনকল্যাণমূলক নিরাপত্তা প্রদান করা হবে, যখন সেটিকে ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত করা যায়—এই প্রশ্নই তার ভাবনার কেন্দ্রে।
এই মানসিকতা কেবল কিছু বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে একটি যৌথ কাঠামো হিসেবে নয়, বরং একাধিক লেনদেনের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখার প্রবণতা। এখানে প্রতিটি অঙ্গীকার দরকষাকষির বিষয়, প্রতিটি জোট শর্তসাপেক্ষ, আর প্রতিটি জনসম্পদ সম্ভাব্য আয়ের উৎস।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র শুধু একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবেই নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নির্মাতা হিসেবে উঠে আসে। এই ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল নিয়ম, উন্মুক্ততা এবং সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত বাণিজ্যকে এগিয়ে নিয়েছে, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন করেছে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছে। এটি করেছে শুধু উদারতার কারণে নয়, বরং নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য।

এই ব্যবস্থার সুফলও স্পষ্ট। উন্মুক্ত বাজার এবং নিরাপদ সমুদ্রপথের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রসারিত হয়েছে—যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কোম্পানিগুলো সফল হয়েছে, ডলার বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব বিস্তার করেছে জোরপূর্বক নয়, বরং আকর্ষণ ও পারস্পরিক নির্ভরতার মাধ্যমে।
এই ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। তাৎক্ষণিক লাভের বাইরে ভবিষ্যতের সুবিধা দেখতে হয়েছে। নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠান ও জোটে বিনিয়োগ করতে হয়েছে, যদিও সেগুলো দ্রুত ফল দেয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই বিনিয়োগগুলোই বড় সাফল্য এনে দিয়েছে।
ট্রাম্পের পদ্ধতি এই যুক্তিকে উল্টে দেয়। তিনি তাৎক্ষণিক লাভকে অগ্রাধিকার দেন। মিত্রদের থেকে বেশি অর্থ আদায় করা গেলে সেটাই সাফল্য, বাণিজ্য অংশীদারদের চাপ দিয়ে ছাড় আদায় করা গেলে সেটাই অর্জন। আর কৌশলগত প্রতিশ্রুতিগুলোকে যদি আয়ের উৎসে পরিণত করা যায়, তাহলে সেটাই সবচেয়ে লাভজনক।
তবে এই পথের একটি বড় মূল্য আছে। এতে বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়, জোট দুর্বল হয়, আস্থা নষ্ট হয় এবং পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এই ক্ষতিগুলো তাৎক্ষণিক নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গভীর প্রভাব ফেলে।
অনেক বিশ্লেষক এই আচরণকে “শিকারি আধিপত্যবাদ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়—রোম, হাবসবুর্গ সাম্রাজ্য, নেপোলিয়নের ফ্রান্স কিংবা সাম্রাজ্যবাদী জার্মানি—সবাই বাণিজ্যপথ থেকে সরাসরি লাভ আদায় করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষত্ব ছিল ভিন্নভাবে নিজের স্বার্থকে দেখা। তারা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যেখানে অন্য দেশগুলোও অংশ নিতে পারে এবং সবার জন্যই কিছু না কিছু লাভ থাকে। তারা নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করলেও সংযম দেখিয়েছে। তারা বুঝেছিল, দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বজায় রাখতে হলে সেটিকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।
আজ সেই পথ প্রশ্নের মুখে।
হরমুজ প্রণালীকে যদি একটি টোল আদায়ের স্থান হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তা ইতিহাস ও কৌশল—দুটোকেই ভুলভাবে বোঝা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লাভ আসে না প্রতিটি জাহাজ থেকে অর্থ আদায় করে, বরং এমন একটি বিশ্ব তৈরি করে যেখানে বাণিজ্য অবাধে চলতে পারে এবং সেখানে তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়।
এই মডেল ছেড়ে স্বল্পমেয়াদি লাভের পথে হাঁটা মানে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা বিসর্জন দেওয়া। যদি যুক্তরাষ্ট্র অন্য যেকোনো শিকারি শক্তির মতো হয়ে ওঠে, তাহলে ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—এমন শক্তিকে মানুষ ভয় পায়, ঘৃণা করে এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ করে। আর সময়ের সঙ্গে তা টিকে থাকে না, বরং ভেঙে পড়ে।
ফারিদ জাকারিয়া 



















