হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে ইরান যে প্রায় ২০ লাখ ডলার করে টোল আদায়ের চেষ্টা করছে, তা আন্তর্জাতিক আইন এবং সামুদ্রিক রীতিনীতির বিরোধী বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রণালীর আইনি অবস্থান
হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানির বড় একটি অংশ পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, এই ধরনের আন্তর্জাতিক নৌপথে সব দেশের জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের আঞ্চলিক জলসীমা থাকলেও আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচল বাধাগ্রস্ত করা বা টোল আরোপ করা বৈধ নয়। বিশেষ করে এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল “নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত” হওয়ার কথা এবং তা কোনো রাষ্ট্রের দ্বারা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।

ইরানের অবস্থান ও বিতর্ক
ইরান ১৯৮২ সালে সমুদ্র আইন চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তা অনুমোদন করেনি। ফলে তারা পুরোপুরি এই আইনের অধীন নয় বলে দাবি করে। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনকি চুক্তি অনুমোদন না করলেও প্রচলিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রাকৃতিক প্রণালী দিয়ে চলাচলের জন্য টোল আদায় করা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কোনো খাল নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক জলপথ—এ কারণে এখানে এমন অর্থ আদায়ের কোনো ভিত্তি নেই।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রণালীর ব্যবহার
সম্প্রতি সংঘর্ষ চলাকালে ইরান হরমুজ প্রণালীকে একটি কৌশলগত চাপের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলিও প্রভাবিত হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইরান খুব সীমিত সংখ্যক জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এই ধরনের আচরণ বৈষম্যমূলক এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

প্রণালীর ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালী উত্তর দিকে ইরান এবং দক্ষিণে ওমানের জলসীমা নিয়ে গঠিত। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল চওড়া, ফলে দুই দেশের জলসীমা একে অপরের সাথে মিলে যায়।
প্রতিদিন প্রায় ১৩৫টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। এত বেশি জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত ট্রাফিক ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে একটি আলাদা করিডোর তৈরি করেছে, যেখানে শুধুমাত্র তাদের অনুমোদিত জাহাজ চলাচল করতে পারছে। এতে বৈশ্বিক বাণিজ্য অনেকটাই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
হরমুজ প্রণালীতে এই সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য জ্বালানির দাম বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্য ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















