ব্রিটেনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সহায়ক মৃত্যুর আইন এবারও বাস্তবায়নের পথে বড় ধাক্কা খেল। জনমতের প্রবল সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সংসদের জটিল প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক দ্বিধার কারণে বিলটি কার্যত থমকে গেছে। ফলে জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা রোগীদের জন্য আইনি সহায়ক মৃত্যুর সুযোগ এখনও অনিশ্চিতই রয়ে গেল।
দীর্ঘদিনের বিতর্ক, নতুন আশার সূচনা
গত কয়েক দশক ধরে ব্রিটেনে সহায়ক মৃত্যুকে বৈধ করার চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের জুনে পরিস্থিতি কিছুটা বদলায়, যখন সংসদের নিম্নকক্ষে একটি বিল পাস হয়। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, মানসিকভাবে সুস্থ এবং ছয় মাসের কম সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকা প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের জন্য কঠোর নিয়ম মেনে জীবন শেষ করার ওষুধ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।
এই আইনটি বিশ্বের অন্যতম কঠোর কাঠামোর মধ্যে পড়ত। ফলে অনেকেই আশা করেছিলেন, ব্রিটেন অবশেষে এই বিষয়ে অন্যান্য উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়াবে।
হাউস অব লর্ডসে বাধা
কিন্তু সেই আশায় ভাটা পড়ে হাউস অব লর্ডসে গিয়ে। অল্পসংখ্যক সদস্যের আপত্তি ও ব্যাপক সংশোধনী প্রস্তাবের কারণে বিলটি আটকে যায়। প্রায় ১৩০০টি সংশোধনী জমা পড়ে, যা এই পর্যায়ে একটি রেকর্ড। এর মধ্যে অনেকগুলো ছিল বিতর্কিত ও অপ্রয়োজনীয় বলেও সমালোচনা ওঠে।
ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
রাজনৈতিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ব্যর্থতার পেছনে বড় কারণ হলো বিলটি ব্যক্তিগত সদস্যের উদ্যোগে আনা। সরকারের পূর্ণ সমর্থন ও প্রস্তুতি ছাড়া এমন সংবেদনশীল বিষয়ে আইন পাস করা কঠিন।
অন্যদিকে, সরকার নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, ওষুধ ব্যবস্থাপনা বা প্যালিয়েটিভ কেয়ার উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্পষ্ট করা যায়নি।

জনমত বনাম সংসদ
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে জনমত ও সংসদের অবস্থানের মধ্যে ফারাক। জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের বেশিরভাগ মানুষই সহায়ক মৃত্যুর পক্ষে। তবুও সংসদ সদস্যরা শেষ পর্যন্ত দ্বিধায় পড়ে যান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নৈতিক ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে ভোটারদের অগ্রাধিকার তুলনামূলক কম থাকে। ফলে রাজনৈতিক চাপও কম থাকে, আর সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েন।
আশঙ্কা ও বিতর্ক
বিরোধীদের প্রধান আশঙ্কা হলো—এই আইনের অপব্যবহার হতে পারে। পরিবার বা রাষ্ট্রের চাপের কারণে কেউ অকাল মৃত্যু বেছে নিতে বাধ্য হতে পারেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা থাকলে এই ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সমর্থকরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতায় এ ধরনের বড় অপব্যবহারের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং তারা যুক্তি দিচ্ছেন, অসহনীয় যন্ত্রণায় থাকা রোগীদের জন্য বিকল্প না থাকা আরও বড় সমস্যা।
সামনে কী পথ?
এখন প্রশ্ন—এই আইন কি আবার সামনে আসবে? সম্ভাবনা রয়েছে, সরকার চাইলে নতুন করে বিল আনতে পারে বা তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারে। এছাড়া কোনো সংসদ সদস্য আবার একই ধরনের প্রস্তাব আনতে পারেন।
তবে এমনকি ভবিষ্যতে বিল পাস হলেও তা কার্যকর হতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
গভীরতর প্রশ্ন
এই পুরো ঘটনায় একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—জীবন-মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার হাতে থাকা উচিত? সংসদ, নাকি সরাসরি জনগণ?
এই বিতর্ক এখনই থামছে না, বরং ভবিষ্যতে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ব্রিটেনে সহায়ক মৃত্যুর আইন নিয়ে নতুন করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা শুধু একটি আইনের প্রশ্ন নয়—এটি মানবিকতা, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে গভীর চিন্তারও বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















