ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় মাওবাদী আন্দোলন এখন স্পষ্টভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। একসময় যেখানে সশস্ত্র প্রভাব ছিল প্রবল, সেখানে এখন আত্মসমর্পণ, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
আত্মসমর্পণের পেছনের গল্প
বিজাপুরের গৌরি কুডিয়াম, যিনি একসময় মাওবাদী সংগঠনের সদস্য ছিলেন, এখন একটি পোশাক কারখানায় সেলাই শেখার মাধ্যমে নতুন জীবন শুরু করেছেন। ২০২৫ সালে স্বামীর মৃত্যু এবং সংগঠনের ভাঙনের পর তিনি আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মতো আরও হাজার হাজার সদস্য গত কয়েক বছরে অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ছত্তিশগড়ে ২,৭৬২ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছেন। ২০০৫ সাল থেকে এই সংখ্যা ৮,৪৭৭। সারা দেশে একই সময়ে আত্মসমর্পণ করেছেন প্রায় ৪,৮৩৯ জন।
নেতৃত্বের পতন ও নেটওয়ার্ক ভাঙন
মাওবাদী সংগঠনের দুর্বলতার বড় কারণ তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের পতন। ২০২৫ সালের মে মাসে শীর্ষ নেতা বাসভারাজুর মৃত্যুর পর সংগঠনের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে। একের পর এক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নিহত বা গ্রেপ্তার হওয়ায় নেতৃত্বহীনতা তৈরি হয়।
প্রাক্তন কমান্ডার চন্দ্রাইয়া ওরফে পাপা রাও বলেন, নেতৃত্বের পতনের পর সংগঠন ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে, ফলে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর বিস্তার
২০০৮-০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ২০২১ সালের পর আরও জোরদার হয়। প্রায় ৪০৬টি নতুন নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়, যা আগে প্রশাসনের নাগালের বাইরে থাকা এলাকাগুলিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এর পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ, মোবাইল টাওয়ার স্থাপন, স্কুল ও রেশন দোকান তৈরি—এসব উন্নয়ন কার্যক্রম মাওবাদী প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০১৪ সালের পর থেকে প্রায় ১৭,৫৮৯ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১২,০০০ কিলোমিটার ইতিমধ্যেই সম্পন্ন।
আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসন নীতি
সরকার আত্মসমর্পণকারী মাওবাদীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা চালু করেছে। এতে রয়েছে আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ, মাসিক ভাতা এবং জমি বরাদ্দ। অস্ত্র জমা দিলে অতিরিক্ত প্রণোদনাও দেওয়া হয়।
তবে অনেকের মতে, এই সুবিধাগুলো নয়, বরং সংগঠনের ভাঙনই আত্মসমর্পণের প্রধান কারণ।
বস্তারের পরিবর্তিত চিত্র
নারায়ণপুর জেলার কচ্ছাপাল গ্রামে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো রাস্তা পৌঁছায়। একসময় যা মাওবাদীদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে এখন বাড়ি, স্কুল এবং দোকান গড়ে উঠছে। মোবাইল নেটওয়ার্কও সম্প্রতি চালু হয়েছে।
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আগে তারা মাওবাদী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মাঝখানে পড়ে নির্যাতনের শিকার হতেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে, চলাফেরা সহজ হয়েছে এবং কাজের সুযোগও বেড়েছে।
উন্নয়ন বনাম বিতর্ক
উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে খনন কার্যক্রমও বাড়ছে, যা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, বন উজাড় এবং শিল্পপতিদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এই উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরের দ্বিধা
আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসন নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের মতে, যারা আগে সহিংসতায় জড়িত ছিল, এখন তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি
যদিও সরকার দাবি করছে মাওবাদী প্রভাব প্রায় শেষ, তবুও কিছু এলাকায় এখনও ৩০-৪০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। তাই পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এলেও সতর্কতা বজায় রাখা জরুরি।
নতুন জীবনের সন্ধানে
জগদলপুরের একটি ক্যাফেতে কাজ করছেন ফুলমতি মাণ্ডাভি, যিনি ১৪ বছর বয়সে মাওবাদীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। এখন তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে নতুন দক্ষতা অর্জন করছেন।
এমন অনেকেই এখন অস্ত্র ছেড়ে উন্নয়ন ও স্বাভাবিক জীবনের পথে হাঁটছেন, যা বস্তারের দীর্ঘ সংঘাতময় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















