যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। বরং ইরান নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে জাহাজগুলোকে তাদের জলসীমা মেনে চলার সতর্কবার্তা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধবিরতির পরও কমেছে জাহাজ চলাচল
জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবেশ বা প্রস্থান করেছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৮টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত। এতে বোঝা যায়, সাময়িক শান্তি এলেও স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখনও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি।
উপসাগরে আটকে শত শত জাহাজ
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে শত শত তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্যান্য জাহাজ উপসাগরের ভেতরেই আটকে আছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে, যা ইতিহাসের অন্যতম বড় সরবরাহ সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদনেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। একই সঙ্গে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার ক্রেতাদের ওপর।

ইরানের নতুন নির্দেশনা ও বিকল্প রুট
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি বিশেষ পথ নির্ধারণ করেছে। তাদের নির্দেশ অনুযায়ী, জাহাজগুলোকে লারাক দ্বীপের আশপাশ দিয়ে ইরানের জলসীমার ভেতর দিয়ে চলতে হবে, যাতে মাইন পাতা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে যাওয়া যায়।
এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জাহাজগুলোকে লারাক দ্বীপের উত্তর দিক দিয়ে প্রবেশ করতে এবং দক্ষিণ দিক দিয়ে বের হতে হবে, যা তাদের নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
অননুমোদিত জাহাজের জন্য বাড়ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব জাহাজ ইরানের অনুমোদন ছাড়াই চলাচল করছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। এমনকি অনুমতি থাকা সত্ত্বেও কিছু জাহাজকে মাঝপথে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

টোল আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্ক
আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে, ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় করতে পারে। সম্ভাব্য এই টোলের পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু জাহাজকে লারাক দ্বীপ ঘুরে বিকল্প পথে চলতে দেখা গেছে।
তবে পশ্চিমা দেশগুলো এই ধরনের কোনো অর্থ প্রদান করার ধারণার বিরোধিতা করেছে।
জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে দিয়েছেন, যেন তারা এই প্রণালী দিয়ে চলাচলের জন্য কোনো টোল আরোপ না করে।

অন্যদিকে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপান জরুরি ভিত্তিতে আরও তেল মজুত ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
এপ্রিলের শুরুতে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির অন্যতম শর্ত ছিল হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া, যাতে আটকে থাকা শত শত জাহাজ মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, যুদ্ধবিরতি থাকলেও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















