একসময় দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী কল্পনাও করা যেত না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ বিশ্বাস করত—দারিদ্র্য যেন মানবজীবনের স্থায়ী বাস্তবতা। কিন্তু গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, এই ধারণা বদলানো সম্ভব। এখন প্রশ্ন একটাই—দারিদ্র্য শেষ করতে আসলে কত খরচ লাগে?
দারিদ্র্য কমেছে, কিন্তু গতি কমে গেছে
বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে বড় অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশ্বে দারিদ্র্যের হার ৪৩ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১৩ শতাংশে। এই সাফল্যের বড় কারণ ছিল দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিশেষ করে চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে।
তবে ২০১৫ সালের পর সেই অগ্রগতির গতি অনেকটাই কমে গেছে। এখনো প্রায় ৮৩ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছে। দারিদ্র্য এখন বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে এমন অঞ্চলে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তুলনামূলক কঠিন—বিশেষ করে আফ্রিকার কিছু দেশে।
সহজ সমাধান: সরাসরি অর্থ সহায়তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য দূর করার একটি সহজ উপায় হতে পারে সরাসরি অর্থ সহায়তা। ধারণাটা খুবই সরল—যাদের আয় দারিদ্র্যসীমার নিচে, তাদের সেই সীমা পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া।
গণনায় দেখা গেছে, এই ঘাটতি পূরণ করতে ১৯৯০ সালে যেখানে বছরে প্রায় ৩৩০ বিলিয়ন ডলার লাগত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারে।

বাস্তব হিসাব: খরচ খুব বেশি নয়
একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, যদি উন্নত তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে সঠিকভাবে সহায়তা পৌঁছানো যায়, তাহলে বিশ্বজুড়ে চরম দারিদ্র্য প্রায় শেষ করতে বছরে প্রায় ৩১৮ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে। এটি বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের মাত্র ০.৩ শতাংশ।
আরও উচ্চ মানদণ্ডে হিসাব করলেও এই খরচ প্রায় ৪৬৬ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট অর্থনীতির মাত্র ০.৫ শতাংশ। তুলনায়, বিশ্বে বছরে মদ্যপানে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম এই পরিমাণ।
বড় চ্যালেঞ্জ: কারা সবচেয়ে দরিদ্র?
সমস্যা হচ্ছে, সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন—কে কতটা দরিদ্র। অনেক দেশে যেসব পদ্ধতিতে দরিদ্র চিহ্নিত করা হয়, তা প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়। ফলে প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ে যায়, আবার অযোগ্য মানুষ সহায়তা পেয়ে যায়।
নতুন গবেষণায় মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে এমন একটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, যা প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বণ্টন করতে পারে। এতে দারিদ্র্য কমানোর সম্ভাবনা আরও বাড়ে।
বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা
তবে এই হিসাবের মধ্যেও কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। অনেক দেশে প্রশাসনিক দুর্বলতা, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছানো কঠিন। এছাড়া বড় পরিসরে নগদ সহায়তা অর্থনীতিতে চাপও সৃষ্টি করতে পারে।
তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এগুলো অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। মূল বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা।
মানুষের ইচ্ছাই হতে পারে মূল শক্তি
একটি জরিপে দেখা গেছে, উন্নত দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ তাদের আয়ের সামান্য অংশ ছাড়তে রাজি, যদি তা দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হয়।
সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট—দারিদ্র্য দূর করা এখন আর অসম্ভব স্বপ্ন নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং মানবিক উদ্যোগ থাকলে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















