আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের দেশ বুরকিনা ফাসোতে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের আড়ালে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা গত কয়েক বছরে শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, যা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
সহিংস অভিযানের ভয়াবহ চিত্র
২০২৩ সালের শেষ দিকে উত্তরাঞ্চলে একটি সামরিক ঘাঁটিতে জঙ্গি হামলার পর সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা বাহিনী আশপাশের অন্তত ১৬টি গ্রামে অভিযান চালায়। ওই অভিযানে শত শত সাধারণ মানুষ নিহত হন। অনেককে ঘর থেকে বের করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। বেঁচে ফেরা মানুষদের ভাষায়, এটি ছিল নির্মম হত্যাযজ্ঞ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সংঘটিত ৫৭টি হামলায় অন্তত ১৮০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যার বেশিরভাগই সরকারি বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। যদিও সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, সেনাবাহিনীকে কালিমালিপ্ত করতেই এসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
কৌশল হিসেবে ‘পুড়িয়ে দেওয়া নীতি’
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সাল থেকে দেশটিতে জঙ্গি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই সেনাবাহিনী কঠোর দমননীতি অনুসরণ করছে। তবে বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে এই কৌশল আরও কঠোর হয়েছে, যেখানে বেসামরিক মানুষকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের কৌশল উল্টো সাধারণ মানুষকে জঙ্গিদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা সরকারের নিয়ন্ত্রণকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর ভূমিকা ও জাতিগত উত্তেজনা
সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হাজার হাজার মানুষ এই বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে, যাদের অনেকেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়। ফলে প্রতিশোধমূলক হামলা বেড়েছে এবং সহিংসতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কোনো গ্রাম জঙ্গিদের হামলা থেকে রক্ষা পেলেও পরে তা সেনাবাহিনী বা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর আক্রমণের শিকার হচ্ছে। আবার যেসব গ্রামে এই বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে, সেগুলো জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
ফুলানি জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে অভিযান
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশটির ফুলানি জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এই জনগোষ্ঠীকে প্রায়ই জঙ্গিদের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।
এর ফলে অনেক ফুলানি পরিবারকে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, তাদের সম্পদ লুট করা হয়েছে এবং সামাজিক মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণাও ছড়ানো হচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও সহিংসতার বিস্তার
বুরকিনা ফাসোর প্রতিবেশী দেশ মালি ও নাইজারেও একই ধরনের সামরিক শাসন চলছে এবং সেখানেও বেসামরিক বাহিনীকে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বুরকিনা ফাসোতেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এখানে সাধারণ মানুষ সহজেই সংঘর্ষের মাঝে পড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সরকার পরিচালিত প্রচারণা ও বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণও সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
জঙ্গি হুমকি কমছে না
এত কঠোর অভিযানের পরও জঙ্গি হুমকি কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং কিছু অঞ্চলে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং অনেক জায়গায় তারা কার্যত শাসনব্যবস্থার মতো আচরণ করছে।
তবে এই পরিস্থিতি এখনো সরকারের অবস্থানকে খুব একটা নড়বড়ে করেনি। রাজধানী দখলের মতো অবস্থানে জঙ্গিরা না পৌঁছানোয় এবং অনেক এলাকায় সরকারের কঠোর নীতির প্রতি সমর্থন থাকায় বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে আছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ দুই দিক থেকেই আঘাত পাচ্ছে—একদিকে জঙ্গিদের হামলা, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর কঠোর অভিযান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















