দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে ক্রুড তেলের ঘাটতি যে ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছিল, তার ইঙ্গিত মিলছিল আগেই। শেষ পর্যন্ত ১৪ এপ্রিল সেই সংকট চূড়ান্ত রূপ নেয়। চট্টগ্রামে অবস্থিত এই শোধনাগারটির পরিশোধন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে সামনে এসেছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার ঝুঁকি।
সবশেষ ১২ এপ্রিল বিকেলে পরিশোধন কাজ চালানো হয়েছিল। এরপর মজুদ ক্রুড তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি। সংকট মোকাবিলায় আগেই পরিশোধনের পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়েছিল। যেখানে দৈনিক গড়ে ৪ হাজার ৫০০ টন ক্রুড তেল পরিশোধন করা হতো, তা কমিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় সম্পূর্ণভাবে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
সংকটের পেছনের বাস্তবতা
এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বৈশ্বিক উত্তেজনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাবে গত কয়েক মাস ধরে ক্রুড তেল আমদানি নিয়মিত রাখা সম্ভব হয়নি। জাহাজ চলাচল, সরবরাহ সূচি এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে একটি চাপ তৈরি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের একমাত্র শোধনাগারে।
এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখনো বহুলাংশে আমদানি নির্ভর। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সামান্য পরিবর্তন হলেও তার ঢেউ এসে লাগে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থায়।
আপাত স্বস্তি, কিন্তু ভিতরে চাপ
শোধনাগার বন্ধ হলেও জ্বালানি বিভাগ বলছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। ডিজেল, পেট্রল বা অকটেন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সক্ষমতা এখনো বজায় আছে।
তবে এই স্বস্তি পুরোপুরি নির্ভর করছে আগের মজুদ এবং আমদানির ওপর। অর্থাৎ, দীর্ঘ সময় ধরে শোধনাগার বন্ধ থাকলে চাপ বাড়বে, খরচ বাড়বে এবং বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার ওপর নির্ভরতা আরও গভীর হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির কৌশলগত গুরুত্ব
ইস্টার্ন রিফাইনারি শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের জ্বালানি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সীমিত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এটি দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে একটি স্থিতিশীলতা দেয়।
দীর্ঘদিন ধরেই এই শোধনাগার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বিদেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিল, সেই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
কর্তৃপক্ষ আশা করছে, মে মাসে নতুন ক্রুড তেলের চালান দেশে পৌঁছালে আবার পরিশোধন কার্যক্রম শুরু করা যাবে। তবে বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে এই ধরনের সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।
এই ঘটনা তাই শুধু একটি শোধনাগারের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার খবর নয়। এটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং বৈশ্বিক নির্ভরতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। আপাতত সরবরাহ ঠিক থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















