১১:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
ট্রাম্পের প্রতি ইউরোপের বদলে যাওয়া মনোভাব, ভেঙে পড়ছে পুরোনো নির্ভরতা ইরান যুদ্ধ: সাম্রাজ্য পতনের ইঙ্গিত নয়, বরং পুরোনো নীতির পুনরাবৃত্তি চীনে যাচ্ছে ডিসিসিআই প্রতিনিধিদল, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জোরদারে নতুন উদ্যোগ গোয়েন্দা কনানের বিস্ময়কর সাফল্য: ছোট্ট গোয়েন্দা থেকে বিশ্বজোড়া বক্স অফিস জাদু বই ‘রেভোলুসি’ ফিরে এল নিজভূমিতে: তরুণ প্রজন্ম, স্মৃতি ও বান্দুংয়ের চেতনা নিয়ে ডেভিড ভ্যান রেইব্রুক মার্কিন অবরোধ, উত্তেজনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা: ইরানকে ঘিরে নতুন সংঘাতের বিস্তার সীমা পুনর্নির্ধারণ, জাতিগত গণনা ও সংরক্ষণ বিল ঘিরে বিরোধীদের আপত্তি; ১৫ এপ্রিলের বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোট দিয়েছি, তবু ‘সন্দেহভাজন’ ভোটার কেন? ২৫০ আসনে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস রাহুলের প্রত্যাবর্তন, প্রিয়াঙ্কাও পথে—পশ্চিমবঙ্গ ভোটে কংগ্রেসের নতুন জোর

সুভাষচন্দ্র বসু: বিপ্লবীর তত্ত্ব ও কর্মের এক দ্বন্দ্বময় সমন্বয়

১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইহোকুতে একটি বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনাবসান ঘটে। এর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় পূর্বের আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী গতিশীলতার এক উচ্চতর সমন্বয় গড়ে তোলার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা। বসু ছিলেন না কেবল বিমূর্ত দর্শনে নিমগ্ন কোনো স্বপ্নদ্রষ্টা, আবার তিনি এমনও ছিলেন না যে নৈতিক প্রশ্নকে উপেক্ষা করে কেবল বাস্তবতার দিকে ঝুঁকবেন। তাঁর নিজের কথায়, তিনি এমন কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন, যা বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য নয় বা যার সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না। এই প্রবন্ধে তাঁর চিন্তার বিবর্তন—নিরপেক্ষ ভাববাদ থেকে দ্বন্দ্বমূলক বাস্তবতাবোধে উত্তরণ—এবং তা তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

দার্শনিক ভিত্তি

বসুর প্রারম্ভিক চিন্তা গড়ে উঠেছিল শঙ্করাচার্যের ব্যাখ্যায় বেদান্ত দর্শনের প্রভাবে। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি অনুভব করেন, মায়াবাদ—যেখানে জগৎকে ভ্রম হিসেবে ধরা হয়—একজন বিপ্লবীর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, একসময় তিনি বিশ্বাস করতেন যে পরম সত্য মানুষের বুদ্ধির নাগালের মধ্যে এবং মায়াবাদই জ্ঞানের সারকথা। কিন্তু পরে তিনি এই অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং নিজেকে আর চূড়ান্ত ভাববাদী মনে করেননি; বরং তিনি হয়ে ওঠেন বাস্তববাদী।

File:Bose AICC meeting 1939.jpg - Wikimedia Commons

মায়াবাদ ত্যাগ করলেও বসু বস্তুবাদে ঝুঁকেননি। তিনি জগতকে বাস্তব ও ক্রমবিকাশমান হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, জগৎ হলো আত্মার প্রকাশ, আর যেমন আত্মা চিরন্তন, তেমনই সৃষ্টি জগতও চিরন্তন। এই জগৎ চিরন্তন শক্তির এক অবিরাম খেলাকে প্রতিফলিত করে—যা তিনি ঐশ্বরিক লীলা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে এই বাস্তবতার মূল স্বরূপ ছিল নৈতিক, এবং তিনি বলেন, তাঁর কাছে বাস্তবতার মৌলিক প্রকৃতি হলো ভালোবাসা।

যদিও তাঁর “আত্মা” ধারণা ভারতীয় উৎস থেকে এসেছে, কিন্তু এর বিকাশের নিয়ম তিনি খুঁজে পান হেগেলের দ্বন্দ্বমূলক তত্ত্বে। তাঁর মতে, চিন্তার জগৎ হোক বা বাস্তব জগৎ—সবকিছুই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। প্রতিটি অবস্থান থেকে জন্ম নেয় তার বিপরীত, এবং এই সংঘাতের সমাধান হয় এক নতুন সমন্বয়ে। বসুর কাছে এই তত্ত্বই ছিল সত্যের সবচেয়ে কাছাকাছি ব্যাখ্যা।

এইভাবে হিন্দু দর্শন ও হেগেলীয় দ্বন্দ্বমূলক চিন্তাকে একত্র করে বসু সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, যেহেতু বাস্তবতা দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়, তাই ব্যক্তির নৈতিক কর্তব্য হলো সেই দ্বন্দ্বে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া। এই বিশ্বাসই তাঁর সাম্যবাদ ধারণার ভিত্তি গড়ে তোলে।

Subhas Chandra Bose addressing a meeting in Berlin in 1933 - PICRYL - Public  Domain Media Search Engine Public Domain Search

সমন্বিত সাম্যের মতবাদ

‘সাম্যবাদ’ শব্দটি সংস্কৃত ‘সাম্য’ এবং ‘বাদ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ সমতা, সুর এবং ঐক্যের মতবাদ। এটি কোনো বিদেশি মতবাদ নয়, বরং ভারতের নিজস্ব দার্শনিক বিবর্তনের ফল—আধুনিক যুগের দ্বন্দ্ব নিরসনের একটি সমন্বিত পথ।

বসু ফ্যাসিবাদ বা সাম্যবাদকে চূড়ান্ত বলে মনে করেননি; বরং তিনি এগুলোকে একটি চলমান দ্বন্দ্ব প্রক্রিয়ার ধাপ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, এই দুই মতবাদের সংঘাত থেকে এমন একটি সমন্বয় সম্ভব, যা উভয়ের ইতিবাচক দিকগুলো ধারণ করবে।

তিনি তাদেরও সমালোচনা করেছিলেন, যারা অন্ধভাবে বিদেশি মতবাদকে ভারতে প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে, একটি বিপ্লবী সংগঠন হিসেবে ফরোয়ার্ড ব্লক কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের নিয়মে আবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশ্বের বিভিন্ন জ্ঞান গ্রহণ করে নিজের মতো করে বিকশিত হতে চায়।

বসু সাম্যবাদকে বিশ্বের রাজনৈতিক ধারায় ভারতের নিজস্ব অবদান হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, যেমন ইংল্যান্ড দিয়েছে সাংবিধানিকতা, ফ্রান্স দিয়েছে স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বের ধারণা, জার্মানি দিয়েছে মার্কসবাদ এবং রাশিয়া দিয়েছে শ্রমিক বিপ্লব—তেমনি ভারতও বিশ্ব সভ্যতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বাস্তবে সাম্যবাদ ছিল একটি আধুনিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের নকশা। এর মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা, বৈজ্ঞানিক উৎপাদনব্যবস্থা, উৎপাদন ও বণ্টনের সামাজিক মালিকানা এবং সমতা ও সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।

65 Subhas chandra bose, India Images: PICRYL - Public Domain Media Search  Engine Public Domain Search

বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা

বসুর কাছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল কেবল শুরু। প্রকৃত লক্ষ্য ছিল দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন। তাঁর মতে, স্বাধীনতা মানে শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়; বরং এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে সমতা প্রতিষ্ঠা—পুরুষ ও নারী, ধনী ও দরিদ্র সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা। এর মধ্যে ছিল সম্পদের সমবণ্টন, জাতিভেদ দূরীকরণ, সামাজিক অবিচার দূর করা এবং সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার অবসান।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসার পর তিনি স্বাধীনতার ধারণা ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি এর বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় মনোযোগ দেন। তিনি শিল্পায়নের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন, যা গ্রামীণ স্বনির্ভরতার ওপর জোর দেওয়া ভাবনার থেকে ভিন্ন ছিল।

তাঁর মতে, জাতীয় পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ হলো দারিদ্র্য দূর করা। এর জন্য প্রয়োজন কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পুনর্গঠন এবং উৎপাদন ও বণ্টনের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

একই সঙ্গে তিনি মনে করতেন, একটি বিভক্ত ও দরিদ্র দেশ পুনর্গঠনের সময় ধীরগতির বিকেন্দ্রীকৃত গণতন্ত্র বহন করতে পারে না। তাঁর ধারণা ছিল, পুনর্গঠনের সময় একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন, যার হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকবে।

তবে এই চিন্তাধারা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা জরুরি। তখন বিশ্বের অনেক দেশ কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন আনছিল। কিন্তু আধুনিক অধিকারভিত্তিক সমাজে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার প্রতি সতর্ক থাকা এবং তা প্রতিরোধ করা গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্পের প্রতি ইউরোপের বদলে যাওয়া মনোভাব, ভেঙে পড়ছে পুরোনো নির্ভরতা

সুভাষচন্দ্র বসু: বিপ্লবীর তত্ত্ব ও কর্মের এক দ্বন্দ্বময় সমন্বয়

০৭:০১:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইহোকুতে একটি বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনাবসান ঘটে। এর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় পূর্বের আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী গতিশীলতার এক উচ্চতর সমন্বয় গড়ে তোলার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা। বসু ছিলেন না কেবল বিমূর্ত দর্শনে নিমগ্ন কোনো স্বপ্নদ্রষ্টা, আবার তিনি এমনও ছিলেন না যে নৈতিক প্রশ্নকে উপেক্ষা করে কেবল বাস্তবতার দিকে ঝুঁকবেন। তাঁর নিজের কথায়, তিনি এমন কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন, যা বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য নয় বা যার সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না। এই প্রবন্ধে তাঁর চিন্তার বিবর্তন—নিরপেক্ষ ভাববাদ থেকে দ্বন্দ্বমূলক বাস্তবতাবোধে উত্তরণ—এবং তা তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

দার্শনিক ভিত্তি

বসুর প্রারম্ভিক চিন্তা গড়ে উঠেছিল শঙ্করাচার্যের ব্যাখ্যায় বেদান্ত দর্শনের প্রভাবে। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি অনুভব করেন, মায়াবাদ—যেখানে জগৎকে ভ্রম হিসেবে ধরা হয়—একজন বিপ্লবীর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, একসময় তিনি বিশ্বাস করতেন যে পরম সত্য মানুষের বুদ্ধির নাগালের মধ্যে এবং মায়াবাদই জ্ঞানের সারকথা। কিন্তু পরে তিনি এই অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং নিজেকে আর চূড়ান্ত ভাববাদী মনে করেননি; বরং তিনি হয়ে ওঠেন বাস্তববাদী।

File:Bose AICC meeting 1939.jpg - Wikimedia Commons

মায়াবাদ ত্যাগ করলেও বসু বস্তুবাদে ঝুঁকেননি। তিনি জগতকে বাস্তব ও ক্রমবিকাশমান হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, জগৎ হলো আত্মার প্রকাশ, আর যেমন আত্মা চিরন্তন, তেমনই সৃষ্টি জগতও চিরন্তন। এই জগৎ চিরন্তন শক্তির এক অবিরাম খেলাকে প্রতিফলিত করে—যা তিনি ঐশ্বরিক লীলা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে এই বাস্তবতার মূল স্বরূপ ছিল নৈতিক, এবং তিনি বলেন, তাঁর কাছে বাস্তবতার মৌলিক প্রকৃতি হলো ভালোবাসা।

যদিও তাঁর “আত্মা” ধারণা ভারতীয় উৎস থেকে এসেছে, কিন্তু এর বিকাশের নিয়ম তিনি খুঁজে পান হেগেলের দ্বন্দ্বমূলক তত্ত্বে। তাঁর মতে, চিন্তার জগৎ হোক বা বাস্তব জগৎ—সবকিছুই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। প্রতিটি অবস্থান থেকে জন্ম নেয় তার বিপরীত, এবং এই সংঘাতের সমাধান হয় এক নতুন সমন্বয়ে। বসুর কাছে এই তত্ত্বই ছিল সত্যের সবচেয়ে কাছাকাছি ব্যাখ্যা।

এইভাবে হিন্দু দর্শন ও হেগেলীয় দ্বন্দ্বমূলক চিন্তাকে একত্র করে বসু সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, যেহেতু বাস্তবতা দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়, তাই ব্যক্তির নৈতিক কর্তব্য হলো সেই দ্বন্দ্বে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া। এই বিশ্বাসই তাঁর সাম্যবাদ ধারণার ভিত্তি গড়ে তোলে।

Subhas Chandra Bose addressing a meeting in Berlin in 1933 - PICRYL - Public  Domain Media Search Engine Public Domain Search

সমন্বিত সাম্যের মতবাদ

‘সাম্যবাদ’ শব্দটি সংস্কৃত ‘সাম্য’ এবং ‘বাদ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ সমতা, সুর এবং ঐক্যের মতবাদ। এটি কোনো বিদেশি মতবাদ নয়, বরং ভারতের নিজস্ব দার্শনিক বিবর্তনের ফল—আধুনিক যুগের দ্বন্দ্ব নিরসনের একটি সমন্বিত পথ।

বসু ফ্যাসিবাদ বা সাম্যবাদকে চূড়ান্ত বলে মনে করেননি; বরং তিনি এগুলোকে একটি চলমান দ্বন্দ্ব প্রক্রিয়ার ধাপ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, এই দুই মতবাদের সংঘাত থেকে এমন একটি সমন্বয় সম্ভব, যা উভয়ের ইতিবাচক দিকগুলো ধারণ করবে।

তিনি তাদেরও সমালোচনা করেছিলেন, যারা অন্ধভাবে বিদেশি মতবাদকে ভারতে প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে, একটি বিপ্লবী সংগঠন হিসেবে ফরোয়ার্ড ব্লক কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের নিয়মে আবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশ্বের বিভিন্ন জ্ঞান গ্রহণ করে নিজের মতো করে বিকশিত হতে চায়।

বসু সাম্যবাদকে বিশ্বের রাজনৈতিক ধারায় ভারতের নিজস্ব অবদান হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, যেমন ইংল্যান্ড দিয়েছে সাংবিধানিকতা, ফ্রান্স দিয়েছে স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বের ধারণা, জার্মানি দিয়েছে মার্কসবাদ এবং রাশিয়া দিয়েছে শ্রমিক বিপ্লব—তেমনি ভারতও বিশ্ব সভ্যতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বাস্তবে সাম্যবাদ ছিল একটি আধুনিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের নকশা। এর মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা, বৈজ্ঞানিক উৎপাদনব্যবস্থা, উৎপাদন ও বণ্টনের সামাজিক মালিকানা এবং সমতা ও সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।

65 Subhas chandra bose, India Images: PICRYL - Public Domain Media Search  Engine Public Domain Search

বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা

বসুর কাছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল কেবল শুরু। প্রকৃত লক্ষ্য ছিল দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন। তাঁর মতে, স্বাধীনতা মানে শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়; বরং এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে সমতা প্রতিষ্ঠা—পুরুষ ও নারী, ধনী ও দরিদ্র সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা। এর মধ্যে ছিল সম্পদের সমবণ্টন, জাতিভেদ দূরীকরণ, সামাজিক অবিচার দূর করা এবং সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার অবসান।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসার পর তিনি স্বাধীনতার ধারণা ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি এর বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় মনোযোগ দেন। তিনি শিল্পায়নের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন, যা গ্রামীণ স্বনির্ভরতার ওপর জোর দেওয়া ভাবনার থেকে ভিন্ন ছিল।

তাঁর মতে, জাতীয় পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ হলো দারিদ্র্য দূর করা। এর জন্য প্রয়োজন কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পুনর্গঠন এবং উৎপাদন ও বণ্টনের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

একই সঙ্গে তিনি মনে করতেন, একটি বিভক্ত ও দরিদ্র দেশ পুনর্গঠনের সময় ধীরগতির বিকেন্দ্রীকৃত গণতন্ত্র বহন করতে পারে না। তাঁর ধারণা ছিল, পুনর্গঠনের সময় একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন, যার হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকবে।

তবে এই চিন্তাধারা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা জরুরি। তখন বিশ্বের অনেক দেশ কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন আনছিল। কিন্তু আধুনিক অধিকারভিত্তিক সমাজে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার প্রতি সতর্ক থাকা এবং তা প্রতিরোধ করা গুরুত্বপূর্ণ।