পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনায় এক বৃদ্ধের চোখের জল এখন বড় এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। ৮৭ বছর বয়সী মম্মথ নাথ ভৌমিক আতঙ্কে কাঁপছেন—তার আশঙ্কা, যদি হঠাৎ করেই তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়!
বৃদ্ধের অসহায় অপেক্ষা
সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে জোকায় ট্রাইব্যুনাল কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মম্মথ নাথ ভৌমিক। হাতে একটি প্লাস্টিকের ফোল্ডার, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ—সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের ছবি।
তিনি একাই এসেছেন। কারণ তার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বুথ পর্যায়ের কর্মকর্তা তার ছেলেকে ফোন করে জানিয়ে দেন, নির্দিষ্ট দিনে তাকে এখানে উপস্থিত হতে হবে।
কথা বলতে বলতেই ভেঙে পড়েন তিনি। কাঁপা গলায় বলেন, “আমার খুব ভয় লাগছে… কেউ আমাদের এই ভয়টা বোঝে না। যদি আমাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়?”
তবে সেদিনও কোনো সমাধান মেলেনি। নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে ফিরিয়ে দেন, কারণ ট্রাইব্যুনালের কাজ তখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি।
ট্রাইব্যুনাল প্রস্তুত, কিন্তু স্পষ্টতা নেই
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের আপিল শুনানির জন্য জোকায় ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। এসব ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্বে রয়েছেন উচ্চ আদালতের বিচারপতি ও প্রধান বিচারপতিরা।
নির্বাচন দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অধিকাংশ বিচারপতি কাজ শুরু করেছেন। তবে কতজন আবেদন জমা দিয়েছেন বা প্রক্রিয়া কতদূর এগিয়েছে—এ নিয়ে এখনও পরিষ্কার কোনো তথ্য নেই। সবকিছু গুছিয়ে আনতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে বলে জানা গেছে।

কড়া নিরাপত্তা, উদ্বেগের ছায়া
ট্রাইব্যুনাল চত্বরজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, পুলিশও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এর পেছনে রয়েছে মালদার সাম্প্রতিক একটি ঘটনা, যেখানে ক্ষুব্ধ জনতা বিচারিক কর্মকর্তাদের ঘেরাও করেছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই প্রশাসন বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে, বিশেষ করে ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে।
আবেদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন, বিভ্রান্তি বাড়ছে
প্রথমে বলা হয়েছিল, বাদ পড়া ভোটাররা সরাসরি ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নিজেদের বক্তব্য রাখতে পারবেন। কিন্তু পরে জানানো হয়, আবেদন অনলাইনে করতে হবে বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।
এই পরিবর্তনে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই অনেকের মতো মম্মথ নাথও নিজেই এসে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন।
অতীতের প্রমাণ, তবুও অনিশ্চয়তা
মম্মথ নাথ ভৌমিক জানান, তার পরিবার ১৯৫৯ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসে এবং তখনই তারা নাগরিকত্বের সনদ পায়। তিনি চার দশকেরও বেশি সময় কলকাতা বন্দরে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে পেনশন পান। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি ভোট দিয়ে আসছেন।
তবুও আজ তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হচ্ছে। তার একটাই চাওয়া—“এই বয়সে আর কিছু চাই না, শুধু একটু শান্তিতে থাকতে চাই।”
সময়ের চাপ, মানুষের ভয়
ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই উদ্বেগ বাড়ছে নাম বাদ পড়া মানুষের মধ্যে। ট্রাইব্যুনাল চালু হলেও অনেকের কাছে পুরো প্রক্রিয়াটি এখনও অস্পষ্ট।
এই পরিস্থিতিতে মম্মথ নাথের মতো অসংখ্য মানুষ একটাই প্রশ্ন করছেন—তাদের পরিচয় কি রক্ষা পাবে, নাকি ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে হারিয়ে যাবে তাদের জীবনভর গড়া অস্তিত্ব?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















