১২:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৪ মে ২০২৬
হংকংয়ের অ্যান্টিক বাজারে লুকানো চীনের হারানো ঐতিহ্য, পাচারের অন্ধকার পথ উন্মোচন চীনের ক্ষমতার কেন্দ্রে কাই চি: শি জিনপিংয়ের ছায়াসঙ্গী নাকি ভবিষ্যতের উত্তরসূরি? আসাম ভোট ২০২৬: শুরুতেই চাপে বিরোধী শীর্ষ নেতারা, ফলাফলের আগে বাড়ছে জনমানসে উত্তেজনা আসামে ভোট গণনা শুরুতেই এগিয়ে বিজেপি, শর্মা ও গৌরব গগৈর লড়াইয়ে নজর কেরালায় ক্ষমতার পালাবদলের ইঙ্গিত, ১৪০ আসনের লড়াইয়ে এগিয়ে কংগ্রেস জোট কলকাতায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, শুরুতেই সমানে সমান তৃণমূল-বিজেপি হাওরে আগাম বন্যার তাণ্ডব: ফসল হারিয়ে চোখের জলে ভাসছে ছাতকের কৃষক তামিলনাড়ু রাজনীতিতে নতুন ঝড়? বিজয়ের টিভিকে-র চমক, শুরুর ফলেই এগিয়ে ৪০-এর বেশি আসনে পশ্চিমবঙ্গে ভোট গণনায় টানটান লড়াই, শুরুতেই এগিয়ে বিজেপি ভারতের পরিসংখ্যানের নতুন লড়াই: আস্থার সংকট পেরিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতায় ফেরার চেষ্টা

তানজানিয়ায় ভোটের পর রক্তঝরা অধ্যায়, সত্য চাপা দেওয়ার অভিযোগে সামিয়ার শাসন ঘিরে তীব্র বিতর্ক

একসময় স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য প্রশংসিত তানজানিয়া এখন গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে। সাম্প্রতিক নির্বাচন, সহিংসতা এবং সেই ঘটনার তদন্ত নিয়ে সরকারের অবস্থান দেশটির গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসানের নেতৃত্বে যে পরিবর্তনের আশা একসময় তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

উত্থান-পতনের ইতিহাসে নতুন সংকট

তানজানিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে নাটকীয় পরিবর্তনের অভাব নেই। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসন থেকে ধীরে ধীরে বহুদলীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং জীবনমানের উন্নতি—সব মিলিয়ে দেশটি আফ্রিকার অনেক দেশের তুলনায় স্থিতিশীলতার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে মাথাপিছু আয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অগ্রযাত্রা থমকে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে সামিয়ার শাসনামলে রাজনৈতিক সহনশীলতা কমে যাওয়ার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

Samia Suluhu Hassan | Children, Husband, Education, Biography, & Facts |  Britannica

শুরুতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি

২০২১ সালে ক্ষমতায় এসে সামিয়া সুলুহু হাসান নিজেকে ভিন্নধর্মী নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। তার পূর্বসূরির সময়কার কঠোর দমন-পীড়নের নীতির পরিবর্তন ঘটিয়ে তিনি রাজনৈতিক পরিসর কিছুটা উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন নীতি—এসব পদক্ষেপে দেশজুড়ে আশাবাদ তৈরি হয়।

তরুণ প্রজন্ম বিশেষভাবে এই পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারা আশা করেছিল, তানজানিয়া ধীরে ধীরে আরও উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের পথে এগোবে।

নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক ও দমন

সেই আশার জায়গায় এখন এসেছে হতাশা। সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ের দাবি করলেও, পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রধান বিরোধী দলকে কার্যত নির্বাচনের বাইরে রাখা হয় এবং তাদের শীর্ষ নেতাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ফলে নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ ও বিরোধী সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানালে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে তা দমন করে। এতে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।

তদন্ত কমিশন ও বিতর্কিত প্রতিবেদন

Tanzania's president blames foreigners for deadly protests after disputed  election | PBS News

এই সহিংসতার পর সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকশ মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হলেও ঘটনার দায় অজ্ঞাত উসকানিদাতা এবং বাহ্যিক শক্তির ওপর চাপানো হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কোনো কঠোর সমালোচনা না থাকায় প্রতিবেদনটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এছাড়া তদন্তের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না করায় এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই তদন্ত প্রকৃত সত্য উদঘাটনের বদলে ঘটনাকে আড়াল করার চেষ্টা।

ভয়ের ছায়ায় সাধারণ মানুষ

বর্তমানে তানজানিয়ায় এক ধরনের নীরবতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে মতামত দিতে ভয় পাচ্ছে। বিরোধী নেতাদের অনেকেই কারাগারে, আর স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও সংকুচিত করছে এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

Tanzania's election by elimination - Index on Censorship

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক মহলেও এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু উন্নয়ন সহযোগী আর্থিক সহায়তা স্থগিত করেছে, তবে তা সরকারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা স্পষ্ট নয়। বড় অর্থনৈতিক অংশীদারদের অনেকে আবার গণতন্ত্র বা মানবাধিকার ইস্যুতে সরব নয়, ফলে সরকারের ওপর চাপ সীমিতই রয়ে গেছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ ও পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই দুটি খাতই দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।

ফিরে আসার সুযোগ কি আছে

বিশ্লেষকদের মতে, এখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। স্বচ্ছ তদন্ত, বিরোধী নেতাদের মুক্তি এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরিস্থিতি উন্নত করা সম্ভব।

তবে এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সেই সদিচ্ছা দেখানো হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তানজানিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হংকংয়ের অ্যান্টিক বাজারে লুকানো চীনের হারানো ঐতিহ্য, পাচারের অন্ধকার পথ উন্মোচন

তানজানিয়ায় ভোটের পর রক্তঝরা অধ্যায়, সত্য চাপা দেওয়ার অভিযোগে সামিয়ার শাসন ঘিরে তীব্র বিতর্ক

১০:৩৮:৪৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

একসময় স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য প্রশংসিত তানজানিয়া এখন গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে। সাম্প্রতিক নির্বাচন, সহিংসতা এবং সেই ঘটনার তদন্ত নিয়ে সরকারের অবস্থান দেশটির গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসানের নেতৃত্বে যে পরিবর্তনের আশা একসময় তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

উত্থান-পতনের ইতিহাসে নতুন সংকট

তানজানিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে নাটকীয় পরিবর্তনের অভাব নেই। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসন থেকে ধীরে ধীরে বহুদলীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং জীবনমানের উন্নতি—সব মিলিয়ে দেশটি আফ্রিকার অনেক দেশের তুলনায় স্থিতিশীলতার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে মাথাপিছু আয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অগ্রযাত্রা থমকে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে সামিয়ার শাসনামলে রাজনৈতিক সহনশীলতা কমে যাওয়ার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

Samia Suluhu Hassan | Children, Husband, Education, Biography, & Facts |  Britannica

শুরুতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি

২০২১ সালে ক্ষমতায় এসে সামিয়া সুলুহু হাসান নিজেকে ভিন্নধর্মী নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। তার পূর্বসূরির সময়কার কঠোর দমন-পীড়নের নীতির পরিবর্তন ঘটিয়ে তিনি রাজনৈতিক পরিসর কিছুটা উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন নীতি—এসব পদক্ষেপে দেশজুড়ে আশাবাদ তৈরি হয়।

তরুণ প্রজন্ম বিশেষভাবে এই পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারা আশা করেছিল, তানজানিয়া ধীরে ধীরে আরও উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের পথে এগোবে।

নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক ও দমন

সেই আশার জায়গায় এখন এসেছে হতাশা। সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ের দাবি করলেও, পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রধান বিরোধী দলকে কার্যত নির্বাচনের বাইরে রাখা হয় এবং তাদের শীর্ষ নেতাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ফলে নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ ও বিরোধী সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানালে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে তা দমন করে। এতে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।

তদন্ত কমিশন ও বিতর্কিত প্রতিবেদন

Tanzania's president blames foreigners for deadly protests after disputed  election | PBS News

এই সহিংসতার পর সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকশ মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হলেও ঘটনার দায় অজ্ঞাত উসকানিদাতা এবং বাহ্যিক শক্তির ওপর চাপানো হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কোনো কঠোর সমালোচনা না থাকায় প্রতিবেদনটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এছাড়া তদন্তের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না করায় এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই তদন্ত প্রকৃত সত্য উদঘাটনের বদলে ঘটনাকে আড়াল করার চেষ্টা।

ভয়ের ছায়ায় সাধারণ মানুষ

বর্তমানে তানজানিয়ায় এক ধরনের নীরবতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে মতামত দিতে ভয় পাচ্ছে। বিরোধী নেতাদের অনেকেই কারাগারে, আর স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও সংকুচিত করছে এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

Tanzania's election by elimination - Index on Censorship

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক মহলেও এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু উন্নয়ন সহযোগী আর্থিক সহায়তা স্থগিত করেছে, তবে তা সরকারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা স্পষ্ট নয়। বড় অর্থনৈতিক অংশীদারদের অনেকে আবার গণতন্ত্র বা মানবাধিকার ইস্যুতে সরব নয়, ফলে সরকারের ওপর চাপ সীমিতই রয়ে গেছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ ও পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই দুটি খাতই দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।

ফিরে আসার সুযোগ কি আছে

বিশ্লেষকদের মতে, এখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। স্বচ্ছ তদন্ত, বিরোধী নেতাদের মুক্তি এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরিস্থিতি উন্নত করা সম্ভব।

তবে এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সেই সদিচ্ছা দেখানো হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তানজানিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর।