ব্রেক্সিট নিয়ে এক সময় যে ভয় ছড়িয়ে পড়েছিল, তা এখন অনেকটাই অতীত। যুক্তরাজ্যের আর্থিক খাত, বিশেষ করে লন্ডনের আর্থিক কেন্দ্র, নতুন করে গতি পাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যেসব আশঙ্কা ছিল—চাকরি হারানো, ব্যবসা সরে যাওয়া—সেসব আশঙ্কা এখন বাস্তবে তেমন দেখা যায়নি। বরং নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে খাতটি আবার শক্ত অবস্থানে ফিরছে।
দশ বছর আগে ব্রেক্সিটের পর লন্ডনের আর্থিক খাত বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকার হারালে লাখ লাখ চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বর্তমানে এই খাতে কর্মসংস্থান প্রায় আগের মতোই রয়েছে এবং অর্থনীতিতে এর অবদানও বেড়েছে।
ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে আর্থিক খাতের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই খাত এখন দেশের মোট উৎপাদনের বড় অংশ জুড়ে আছে এবং কর আয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। লন্ডনের ঐতিহাসিক আর্থিক অঞ্চল ‘সিটি’-তে কর্মসংস্থানও বেড়েছে, যা এই পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট প্রমাণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মনোভাবে। বিনিয়োগকারী ও পেশাজীবীদের মধ্যে আবারও লন্ডনকে ঘিরে আস্থা তৈরি হচ্ছে। বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও লন্ডনে কাজ করার আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
প্রতিযোগিতা বেড়েছে, তবু এগিয়ে লন্ডন
তবে এই সাফল্যের পথে প্রতিযোগিতাও কম নয়। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন শহর যেমন আমস্টারডাম, প্যারিস, হংকং ও সিঙ্গাপুর নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। কিছু ক্ষেত্রে লন্ডন বাজার হারালেও, বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে তার গুরুত্ব এখনও অটুট।
বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, বীমা এবং ডেরিভেটিভসের মতো জটিল আর্থিক খাতে লন্ডন এখনও বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নেটওয়ার্ক, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সময় অঞ্চলের সুবিধা।

তালিকাভুক্তি ও বিনিয়োগে চ্যালেঞ্জ
তবে সব ক্ষেত্রেই সাফল্য সমান নয়। আন্তর্জাতিক কোম্পানির শেয়ার তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে লন্ডনের আকর্ষণ কমেছে। অনেক বড় কোম্পানি এখন অন্য বাজারে যেতে আগ্রহী হচ্ছে। একইভাবে, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক অংশীদারিত্বও কিছুটা কমেছে।
এই পরিবর্তনের একটি বড় কারণ হলো বিশ্বজুড়ে নতুন আর্থিক কেন্দ্রের উত্থান এবং বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর অন্যত্র চলে যাওয়া।
নীতিগত পরিবর্তনে নতুন আশা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান উন্নতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে নীতিগত পরিবর্তন। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করছে, যা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। পেনশন তহবিলকে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া এবং শেয়ার তালিকাভুক্তির নিয়ম সহজ করা এর উদাহরণ।
একই সঙ্গে নতুন আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছে যুক্তরাজ্য।

ভবিষ্যতের সুযোগ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারি ঋণের চাপ থাকায় এসব খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে লন্ডনের আর্থিক খাত আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রেক্সিট-পরবর্তী অনিশ্চয়তা কাটিয়ে লন্ডনের আর্থিক খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তবে এই অবস্থান ধরে রাখতে হলে প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















