দেশের রফতানি খাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তা আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তির বার্তা দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এই উত্থান প্রকৃত চাহিদা বৃদ্ধির ফল নয়, বরং সাময়িক কিছু কারণের প্রতিফলন, যা সামনে আবারও চাপে পড়তে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশের পণ্য রফতানি প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি। তবে পুরো অর্থবছরের চিত্র এখনও দুর্বল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট রফতানি হয়েছে ৩৯.৪০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম ।
নতুন অর্ডার নয়, ব্যাকলগের প্রভাব
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, এপ্রিলের এই প্রবৃদ্ধির পেছনে নতুন অর্ডারের ভূমিকা নেই। মার্চ মাসে ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির কারণে উৎপাদন ও শিপমেন্ট ব্যাহত হয়। ফলে ওই মাসে যেসব পণ্য রফতানি করা যায়নি, তার বড় অংশ এপ্রিল মাসে পাঠানো হয়েছে। এ কারণে এক মাসে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও এটি প্রকৃত বাজার সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয় না।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানাগুলোতে নতুন করে বড় অর্ডার আসেনি বা ক্রেতার চাপও বাড়েনি। ফলে এই প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের লক্ষণ হিসেবে দেখা কঠিন। বরং সামনে আবারও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মে মাস নিয়ে উদ্বেগ
এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা মে মাসকে ঘিরে। মাসের শেষ দিকে আবারও দীর্ঘ ছুটি থাকায় উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে রফতানির গতি আবারও কমে যেতে পারে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইউরোপ-আমেরিকায় চাহিদার ধীরগতি নতুন অর্ডার প্রবাহকে সীমিত করে রেখেছে।

তৈরি পোশাকে মিশ্র সংকেত
দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকে মিশ্র পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে এ খাতে রফতানি হয়েছে ৩১.৭২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২.৮২ শতাংশ কম।
তবে এপ্রিল মাসে খাতটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মাসটিতে পোশাক রফতানি দাঁড়িয়েছে ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। নিটওয়্যার ও ওভেন— দুই খাতেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবুও উদ্যোক্তারা এটিকে স্থায়ী উন্নতি হিসেবে দেখছেন না।
অন্যান্য খাতে ভিন্ন প্রবণতা
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে তুলনামূলক ইতিবাচক ধারা রয়েছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে এ খাতে প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এপ্রিল মাসে এই প্রবৃদ্ধি আরও বেশি।
অন্যদিকে কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্যে সামগ্রিকভাবে পতন থাকলেও এপ্রিল মাসে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি মৌসুমি বা সাময়িক প্রভাব।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ
রফতানি খাতের ওপর একসঙ্গে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং লজিস্টিক দুর্বলতা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকটের কারণে সময়মতো শিপমেন্ট সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা ব্যয়বহুল এয়ার ফ্রেট ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। পাশাপাশি ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সামনের পথ অনিশ্চিত
বিশ্লেষকদের মতে, এপ্রিলের প্রবৃদ্ধি আসলে একটি সাময়িক সমন্বয়কালীন পরিস্থিতি। এটি দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের সূচনা নয়। বরং সামনে মে ও জুন মাসে আবারও ওঠানামা দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে রফতানি খাত এখনও নাজুক অবস্থায় রয়েছে। আগামী কয়েক মাসের প্রবণতাই নির্ধারণ করবে— এই খাত স্থায়ীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি আবারও চাপে পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















