এর আগে বামফ্রন্ট সরকার ১৯৬৭ সালে ময়দানে শপথ নেওয়ার পর জনসভা করেছিলেন, সে সভা জনসমুদ্র ছিল। সেদিনের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় তাঁর গলার মালা খুলে জনসমুদ্রের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। সেই উত্তাল ঢেউয়ে সে মালা ভাসতে ভাসতে সমুদ্রের কোন অতলে হারিয়ে গেছে। অজয়বাবুর মতো একজন স্বাধীনতা যোদ্ধা এবং সেদিনের বাম পূজিত জননায়ক লোক চক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গিয়েছেন।
স্বাধীন বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী কেমিস্ট্রির অধ্যাপক প্রফুল্ল ঘোষ, আর একজন মুখ্যমন্ত্রী আরামবাগের গান্ধী প্রফুল্ল সেন শেষ জীবনে অনুদানের ওপর বেঁচে ছিলেন। তাঁদের মৃত্যুর পর লোকে জেনেছিল, তিনি বেঁচে ছিলেন।
আপনার নামের আগে আছে S।
S for Success। প্রতিটি sucess এর পিছনে দুটি করে L থাকে। L মানে Labour। প্রচন্ড পরিশ্রম। আপনার মতো এতো পরিশ্রমী ‘বিরোধী-নেতা’ আমি দেখিনি।
আর একটা L হলো Luck। যে আপনাকে একেবারে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসিয়ে দিল। আপনি ব্যারিস্টার নন। Film star নন। অক্সফোর্ডের প্রাক্তনী নন। আপনি নিজেও স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিক ছিলেন না। আপনি নাটক করে লোক জড়ো করেননি। নিজেও কবিতা লেখেন না। ছবি আঁকেন না। কিন্তু আপনি দৈত্য নিধন করে তাক লাগিয়ে দিলেন। যে ঈশ্বর মূককে বাচাল করেন এবং বাচালকে উন্মাদিনী করে দেন, তিনি আজ বাংলার সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে আপনার হাতে বাংলার নেতৃত্ব ভার তুলে দিলেন।
যেমন একশো বছরের মাৎস্যন্যায় যুগের পর একটি সাধারণ ঘরের পাড়ার ছেলে গোপালকে বাংলা সিংহাসনে বসিয়েছিল। সেই গোপাল ৪০০ বছর ধরে একটি গৌরবময় স্থায়ী সরকার বাংলার মানুষকে উপহার দিয়ে গিয়েছিলেন।
আপনি দশটি বছর বাংলার মানুষকে একটি দুর্নীতি মুক্ত, সিন্ডিকেট মুক্ত, জরু ও গরু পাচার মুক্ত প্রশাসন উপহার দিয়ে যান। মানুষ চিরকাল আপনাকে মনে রাখবে।

ধর্ম দিয়ে যেন মানুষের বিচার না হয়। ডিগ্রী কিংবা Pay ডিগ্রী দিয়ে নয়। কর্ম দিয়ে মানুষের বিচার করুন। মনুষ্যত্ব দিয়ে মানুষ যাচাই করুন। বাংলায় আজ মনুষ্যত্বের কোন দর নেই, চরিত্রের কোনো কদর নেই। সৎ মানুষদের সমাজ নির্বোধ ভাবে। হুমকিকেই ভাবে বীরত্ব, দুধেল গাইরা যা খুশি গাইতে পারে। দলে যোগ থাকলে অন্য দলের সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে পারে।
রেনেসাঁসের বাংলা তার consciousness হারিয়ে বসে আছে। তার ফলে সে অধঃপতনকে মনে করে পাতাল প্রবেশ। মেট্রো স্টেশনে নামা, নিচে নামা নয়। সে মনে করে যেহেতু বুদ্ধিজীবীদের কেনা যায়, তাই AI যুগে বুদ্ধিও কেনা যায়। সমাজ মাধ্যম নতুন শব্দ জুড়েছে ডিপ ফেক। ট্রোল, মিম, বুলিইন। নতুন অর্থ নিরপেক্ষতা মানে সুবিধাবাদ। দল-দর্পী মানেই বল-দর্পী ।
ক্ষমতা বন্যার জলের মতো। যখন ঢোকে তখন কিছু কচুড়ি পানা নিয়ে আসে। আপনাকে চতুর হলে চলবেনা ব্রহ্মার মতো চতুরানন হয়ে সব কিছু লক্ষ্য রাখতে হবে। শুধু মক্কার (পড়ুন দিল্লী) দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবেনা। অযোধ্যা পাহাড় থেকে জঙ্গল মহল সব দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। সবাইকে আইনের চোখে সমান দৃষ্টিতে দেখুন। শুধু দেখলে হবেনা বুঝতে হবে। আপনার পূর্বসুরি ভোট বুঝতেন, মানুষকে বুঝতেন না। তবে মানুষ এতবছর পরে তাঁকে বুঝেছে। সাধারণত বাঙালি ৩৪ বছর পরে বোঝে। এবার পনের বছর লাগলো বুঝতে। আপনি বুদ্ধিমান পোড় খাওয়া মানুষ, ছমাসে বুঝে যাবেন। এর মধ্যে ডাবল ইঞ্জিন লেগেছে কিনা স্পিড দেখে যাত্রীরা বুঝতে পারবে।
জানি অনেক কাজ আপনার হাতে। আপনার সহযোগীরা এই প্রথম ব্যাট করছেন। একমাত্র আপনারই ম্যাচ এ নামার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু বাংলার সমস্যাটা শুধু বেকারি আর চুরির নয়। এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, সমস্যাটা সামাজিক। বঙ্গসমাজ আজ একটি survival society তে পরিণত হয়ে গেছে। আপনি কাউকে জিজ্ঞাসা করুন কেমন আছেন? সে বলবেনা ভালো আছি। কোটিপতি হলেও না। বলবে চলে যাচ্ছে। তার মানে কোনো মতে survive করছি। মানুষের আয় বেড়েছে, কিন্তু ভয় বেড়েছে অনেক গুন। প্রতিটি মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। হারিয়ে গেছে trust, mutual respect আর bonding।

কালস্রোতে জীবন যৌবন ধন মান যায় জানি। কিন্তু নিজের অস্তিত্বটি, নিজের বিশ্বাস হারায় কি?
হ্যাঁ হারায়।
নৈতিক সমাজ যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে প্রসাদের ছাদটি আগে ভেঙে পড়ে। মাথার ওপর ছাদ থাকেনা। একদা বাস্তুহারা বাঙালি মাথার ওপর যে ছাদ পেয়েছিল সেটা ভেঙে পড়ে সে আজ নিঃস্ব। এই দৈন্য চরিত্র হারানোর দৈন্য। রাজনীতি তাড়িত সমাজ তাকে ভোগবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অথচ সৎ পথে খেটে খাবার সুযোগ তার হাতে তুলে দেয়নি। তাই সবাই পালাতে চায়। পূজোর সময় না হয় ভোটের সময় ফিরতে চায়।
আমি চেয়েছিলাম অন্তত আগামী প্রজন্ম মূল্যবোধের mooring এ বাঁধা থাকুক। ভোগবাদী সমাজের উত্তাল ঢেউ তাদের জীবন তরীকে ভাসিয়ে না নিয়ে যায়।
আমি প্রয়াত কান্তি বিশ্বাস ও পরাজিত ব্রাত্য বসুর কাছে অনুরোধ নিয়ে গিয়েছিলাম নৈতিক সমাজ ছাড়া সব সমাজ টক্সিক হয়ে যাবে আর স্কুলে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের শিক্ষা আবশ্যিক না করলে মানুষ বিষাক্ত হয়ে উঠবে। কিন্তু ওরা শুনলেন না। ভাবলেন মানুষ নৈতিক হলে ওদেরই ক্ষতি।
আপনিও কি তাই মানে করেন?
আমি তা করিনা। তাই গত ২৫ বছর ধরে আমি মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে আসছি। এখন অনেকে আমার সঙ্গে।
আপনি নতুন চিন্তা নিয়ে এসেছেন। চরিত্র গঠনের শিক্ষা নিয়ে কেউ ভাবেননি। আপনি ভাবুন না। স্কুলে মূল্যবোধ শিক্ষা চালু করুন।
আপনি সুস্থ থাকুন।
ওঁ অয়মারম্ভ শুভায় ভবতু।
আমার আবেদন যদি পাঠকদের ভাল লাগে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ এই আবেদনে আপনাদের কমেন্ট দিন। মানননীয় মুখ্যমন্ত্রী আপনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক।
ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়
সাংবাদিক ও লেখক
ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় 


















