ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে স্থলভিত্তিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে কল্পনা করেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা ভিন্ন। এখন অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং সামরিক প্রভাব—সবকিছুর কেন্দ্র ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে সমুদ্রপথের দিকে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ভারতের গ্রেট নিকোবর প্রকল্পকে বুঝতে হবে। এটি কেবল একটি বন্দর নির্মাণ পরিকল্পনা নয়; বরং ভারত কীভাবে নিজেকে ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তি হিসেবে পুনর্গঠন করতে চায়, তার একটি বড় পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ।
আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর বহু বছর ধরে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, নাজুক এবং সীমিত অবকাঠামোর একটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সামুদ্রিক ভূরাজনীতির মানচিত্রে এর অবস্থান অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। মালাক্কা প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল কার্যত ভারত মহাসাগর ও পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যপথের সংযোগস্থল।
বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই করিডর দিয়ে চলাচল করে। চীনের জ্বালানি আমদানির বিশাল অংশও এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যে দেশ এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরি করতে পারবে, সে কেবল বাণিজ্য নয়, কৌশলগত প্রভাবের ক্ষেত্রেও এগিয়ে থাকবে। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা এখন সেই বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে চাইছেন।

গ্রেট নিকোবর প্রকল্পকে অনেকে কেবল একটি বাণিজ্যিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হিসেবে দেখেন। কিন্তু প্রকল্পটির মূল যুক্তি আরও গভীর। এটি ভারতের জন্য একটি ফরোয়ার্ড অপারেশনাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে, যেখান থেকে ভারত সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণ, সামরিক নজরদারি, দীর্ঘমেয়াদি টহল এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়াতে পারবে। আধুনিক ভূরাজনীতিতে “উপস্থিতি” মানে শুধু পতাকা ওড়ানো নয়; বরং ধারাবাহিক নজরদারি, সরবরাহ সক্ষমতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা।
চীনের সামুদ্রিক বিস্তার এই প্রকল্পের পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা। গত দুই দশকে বেইজিং ভারত মহাসাগরজুড়ে বন্দর ও অবকাঠামোর এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। পাকিস্তানের গওয়াদর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোট, মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ কিংবা আফ্রিকার জিবুতি—সবই একটি বৃহত্তর কৌশলগত উপস্থিতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর বিপরীতে ভারত এতদিন তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থানে ছিল। গ্রেট নিকোবর সেই অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক যুক্তিও পুরোপুরি দুর্বল নয়। ভারত এখনো তার বিপুল পরিমাণ ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো বিদেশি বন্দরের মাধ্যমে পরিচালনা করে। এর ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি কৌশলগত নির্ভরতাও তৈরি হয়। গ্রেট নিকোবর যদি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত হতে পারে, তবে ভারত অন্তত আংশিকভাবে সেই নির্ভরতা কমাতে পারবে।

তবে এই সম্ভাবনাকে অতিরঞ্জিত করাও ভুল হবে। সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর মতো প্রতিষ্ঠিত বন্দরগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সহজ নয়। আন্তর্জাতিক শিপিং নেটওয়ার্ক বিশ্বাসযোগ্যতা, দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। শুধুমাত্র ভৌগোলিক অবস্থান একটি সফল বন্দর গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক অবশ্য পরিবেশ নিয়ে। গ্রেট নিকোবর জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। বন উজাড়, উপকূলীয় পরিবর্তন এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ যথেষ্ট বাস্তব। বিশেষ করে শোমপেন জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিয়ে নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন রয়েছে। সরকার বলছে, প্রকল্পটি পুরো দ্বীপজুড়ে নয়; নির্দিষ্ট এলাকায় সীমিত থাকবে এবং সংরক্ষিত অঞ্চল অক্ষত রাখা হবে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে প্রায়ই বড় ফারাক তৈরি হয়।
এর সঙ্গে আছে ভূমিকম্প ও সুনামির ঝুঁকি। এই অঞ্চল ভূকম্পনপ্রবণ। ২০০৪ সালের সুনামি এখনও দক্ষিণ এশিয়ার স্মৃতিতে তাজা। ফলে এখানে বৃহৎ সামুদ্রিক অবকাঠামো নির্মাণ শুধু ব্যয়বহুল নয়, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার দিক থেকেও জটিল।
তবু রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ ভূগোলকেই কৌশলগত সুবিধায় রূপান্তর করে। প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটি কিংবা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কৃত্রিম দ্বীপ—সবই দেখায়, আধুনিক ভূরাজনীতিতে ঝুঁকি থাকা মানেই পিছু হটা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, একটি দেশ সেই ঝুঁকি পরিচালনার জন্য কতটা প্রস্তুত।

গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের ভবিষ্যৎও সেখানেই নির্ভর করছে। এটি হয়তো ভারতের জন্য কয়েক দশক পরে এক বিশাল কৌশলগত সম্পদে পরিণত হতে পারে। আবার দুর্বল পরিকল্পনা, পরিবেশগত ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক ব্যর্থতার কারণে এটি ব্যয়বহুল ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: এই প্রকল্প ভারতের আত্মপরিচয় নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপন করছে। ভারত কি কেবল উপকূলঘেঁষা একটি আঞ্চলিক শক্তি হয়ে থাকবে, নাকি বৈশ্বিক সামুদ্রিক শক্তির কেন্দ্রে নিজের অবস্থান গড়ে তুলতে চাইবে?
গ্রেট নিকোবর সেই প্রশ্নেরই বাস্তব রূপ। আর তার উত্তর শুধু একটি দ্বীপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং আগামী কয়েক দশকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের অবস্থানও নির্ধারণ করতে পারে।
সাইকিরণ কান্নান 


















