বিশ্বরাজনীতিতে ব্রিকসকে ঘিরে আগ্রহ যত বাড়ছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে—এটি প্রচলিত অর্থে কোনও সামরিক বা রাজনৈতিক জোট নয়। এটি এমন এক মঞ্চ, যেখানে নানা ধরনের রাষ্ট্র একত্রিত হয়েছে মূলত একটি অভিন্ন অনুভূতির কারণে: বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ। এই অসন্তোষের ভাষা এক নয়, উদ্দেশ্যও অভিন্ন নয়, কিন্তু বিদ্যমান শক্তিকাঠামোর বাইরে নিজেদের জন্য বেশি জায়গা তৈরি করার আকাঙ্ক্ষাই তাদের কাছাকাছি এনেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিকসের বিস্তার এবং নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির ফলে অনেকেই একে “গ্লোবাল সাউথ”-এর বিকল্প শক্তিকেন্দ্র হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। ডলারনির্ভর আর্থিক কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার আলোচনা, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ কিংবা নতুন উন্নয়ন ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে এটি একটি বড় ভূরাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। কিন্তু এই বার্তার ভেতরে ঐক্যের চেয়ে সংকেতের গুরুত্ব বেশি।
কারণ বাস্তবতা হলো, ব্রিকসের সদস্যদের স্বার্থ, কৌশল এবং পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে গভীর পার্থক্য রয়েছে। ইরান সংকট সেই সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় ব্রিকস কোনও একক অবস্থান নিতে পারেনি। এটি কেবল কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়; বরং এই গোষ্ঠীর প্রকৃত চরিত্রকে প্রকাশ করে। এখানে এমন দেশও আছে যারা পশ্চিমবিরোধী অবস্থানে দৃঢ়, আবার এমন দেশও আছে যারা পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ফলে ব্রিকসের সম্প্রসারণ যত বাড়ছে, অভ্যন্তরীণ সমন্বয় তত কঠিন হয়ে উঠছে।

তবু এই শিথিলতা বা অসংগতি ব্রিকসকে অকার্যকর করে দেয় না। বরং এর আকর্ষণের একটি বড় অংশ এখানেই। সদস্যদের জন্য এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বাধ্যতামূলক আনুগত্য ছাড়াই সহযোগিতা সম্ভব। কোনও কঠোর জোটের কাঠামো ছাড়া পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করার এই সুযোগই অনেক দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের ভূমিকা সবচেয়ে জটিল। অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রভাবের বিচারে ব্রিকসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেইজিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন নিজেকে “গ্লোবাল সাউথ”-এর মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণাকে সামনে এনে চীন তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
এর পেছনে সুস্পষ্ট কৌশলও রয়েছে। পশ্চিমা শক্তিকেন্দ্রের বাইরে নতুন সম্পর্ক ও বাজার গড়ে তুলে বেইজিং তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে চীনের উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। অবকাঠামো, ব্যাংকিং, জ্বালানি, পরিবহন—বিভিন্ন খাতে চীনা বিনিয়োগ দ্রুত বেড়েছে। অনেক দেশ এটিকে কেবল ভূরাজনৈতিক পক্ষবদল হিসেবে দেখছে না; বরং একক আধিপত্যের বাইরে বিকল্প সম্পর্ক তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখছে।
কিন্তু এখানেই চীনের দ্বৈততা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে বেইজিং বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামোর সংস্কারের কথা বলে, অন্যদিকে সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি দেশও চীন নিজেই। উন্মুক্ত বাজার, বিশ্বায়ন, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা এবং ডলারভিত্তিক অর্থনীতি—সবকিছুর সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সাফল্য গভীরভাবে যুক্ত। ফলে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে খুব বেশি আঘাত করলে তা শেষ পর্যন্ত চীনের নিজের অর্থনীতিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
অর্থাৎ চীনের সামনে এখন সূক্ষ্ম এক ভারসাম্যের প্রশ্ন। তাকে এমনভাবে নেতৃত্ব দিতে হবে যাতে ছোট সদস্যরা আতঙ্কিত না হয়, আবার এমনও নয় যে ব্রিকস দিকহীন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত আগ্রাসী হলে অংশীদারদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হতে পারে, আর অতিরিক্ত সতর্ক থাকলে ব্রিকসের ভেতরের অসন্তোষ ও প্রত্যাশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

ইরান সংকটের সময় ব্রিকসের বিভক্ত প্রতিক্রিয়া সেই সীমাবদ্ধতারই উদাহরণ। একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান হয়তো গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করতে পারত। কিন্তু তার অনুপস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, ব্রিকস এখনো এমন একটি কাঠামো নয় যা আন্তর্জাতিক সংকটে অভিন্ন অবস্থান নিতে সক্ষম। একই সঙ্গে এটি চীনের প্রভাবেরও সীমা নির্দেশ করে।
তবে হয়তো ব্রিকসকে বিচার করার প্রচলিত পদ্ধতিটাই ভুল। যদি একে ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দৃঢ় জোট হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এটি অবশ্যই অসম্পূর্ণ। কিন্তু যদি এটিকে পরিবর্তিত বিশ্ববাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়—যেখানে শক্তি আরও ছড়িয়ে পড়ছে এবং সম্পর্কগুলো স্থায়ী আনুগত্যের বদলে স্বার্থভিত্তিক সমঝোতার ওপর দাঁড়াচ্ছে—তাহলে ব্রিকসের অস্পষ্টতাই তার প্রকৃত পরিচয়।
আজকের বিশ্ব আর আগের মতো কঠোর শিবিরভিত্তিক নয়। রাষ্ট্রগুলো এখন একই সঙ্গে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়। তারা বিকল্প খুঁজছে, কিন্তু সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না। ব্রিকস সেই মানসিকতারই প্রতিচ্ছবি। এটি হয়তো নতুন বিশ্বব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ নকশা নয়, কিন্তু পুরনো ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার শক্তিশালী ইঙ্গিত।
চীনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই ব্রিকস কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো—এই বৈশ্বিক অসন্তোষকে কত দূর পর্যন্ত কাজে লাগানো সম্ভব, নিজের সীমা অতিক্রম না করে। কারণ বর্তমান বিশ্বে নেতৃত্ব মানে কেবল নির্দেশ দেওয়া নয়; বরং ভারসাম্য রক্ষা করা।
লিজিয়া ঝাং 



















