ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। বোর্ড পরীক্ষা, মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষা—সবকিছুই এমন এক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে কয়েকটি নম্বর একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু এখন আর কেবল পড়াশোনা, মেধা বা পরিশ্রমই ফল নির্ধারণ করছে না। আরেকটি অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে—তাপমাত্রা।
এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ৫০টি শহরের সবকটিই ছিল ভারতে। গত এক দশকে দেশের গড় তাপমাত্রা দ্রুত বেড়েছে, আর যে তাপপ্রবাহ একসময় উত্তর ভারতের সীমিত অঞ্চল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন উপকূলীয় এলাকাতেও পৌঁছে গেছে। এই পরিবর্তন শুধু আবহাওয়ার খবর নয়; এটি এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন কোটি কোটি শিক্ষার্থী বছরের সবচেয়ে গরম মাসগুলোতে পরীক্ষায় বসতে বাধ্য হচ্ছে।
সম্প্রতি পরিচালিত একটি গবেষণা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। গবেষকেরা গ্রামীণ অন্ধ্র প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে কয়েক হাজার কিশোর ও তরুণের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জ্ঞানীয় দক্ষতা কমে যায়। গণিত, পাঠ বোঝা কিংবা বিমূর্ত চিন্তার মতো ক্ষেত্রগুলোতে প্রতিটি অতিরিক্ত ডিগ্রি সেলসিয়াস সরাসরি পারফরম্যান্স কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ ৩০ ডিগ্রিতে যে শিক্ষার্থী স্বাভাবিকভাবে ভালো করতে পারে, ৪০ ডিগ্রির মধ্যে একই শিক্ষার্থী উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়ে।
এই পার্থক্য কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। ভারতের মতো দেশে, যেখানে অল্প কিছু নম্বরই একটি আসন নিশ্চিত বা অনিশ্চিত করে দেয়, সেখানে তাপমাত্রাজনিত পারফরম্যান্সের পতন বাস্তবে জীবন বদলে দেওয়ার মতো প্রভাব ফেলতে পারে। একজন শিক্ষার্থী হয়তো বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েছে, কিন্তু পরীক্ষার দিন যদি শ্রেণিকক্ষটি অসহনীয় গরমে ভরে থাকে, তাহলে সেই পরিশ্রমের ফল আর পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রভাব কেবল দুর্বল বা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের মধ্যেও উচ্চ তাপমাত্রা চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে। অর্থাৎ এটি মানবদেহ ও মস্তিষ্কের একটি সাধারণ সীমাবদ্ধতা, যা শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা ব্রাজিলে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা দেখিয়েছে, গরম আবহাওয়া পরীক্ষার ফলাফলকে ধারাবাহিকভাবে খারাপ করে। কোথাও পরীক্ষার দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের সময়মতো স্কুল শেষ করার হার কমেছে, কোথাও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত ক্ষতি দেখা গেছে। অর্থাৎ এটি স্থানীয় কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বৈশ্বিক শিক্ষা-সংকট।
তবে ভারতের বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে অবকাঠামোগত বৈষম্য। দেশের অধিকাংশ পরিবারের ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। বড় শহরের সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থী হয়তো ঠান্ডা ঘরে বসে প্রস্তুতি নিতে পারে, কিন্তু গ্রামের বা ছোট শহরের শিক্ষার্থীকে বিদ্যুৎহীন বা বাতাসহীন কক্ষে একই পরীক্ষার জন্য পড়তে হয়। ফলে পরীক্ষার প্রতিযোগিতা কেবল মেধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য।
এরপরও শিক্ষানীতি এখনো পুরোনো ক্যালেন্ডারেই আটকে আছে। মার্চ থেকে মে—যখন তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে—ঠিক তখনই বোর্ড পরীক্ষা, প্রবেশিকা পরীক্ষা এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। আবহাওয়া দপ্তর ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহের সময়কাল আরও দীর্ঘ হবে এবং গ্রীষ্ম আরও আগে শুরু হবে। অর্থাৎ পরীক্ষার মৌসুম ও তাপদাহের মৌসুম ক্রমশ একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রশ্নটি আর বিলাসী নয়; এটি জরুরি। পরীক্ষার সময়সূচি বদলানো, সকালে পরীক্ষা নেওয়া, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের জন্য ন্যূনতম তাপ-নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরি করা এখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। অনেক রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই তাপপ্রবাহের সময় স্কুলের সময়সূচি পরিবর্তন করে থাকে। কিন্তু সেটি যেন সাময়িক প্রতিক্রিয়া না হয়ে স্থায়ী নীতিতে পরিণত হয়।
ভারত বহু বছর ধরে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে কাজ করেছে। বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বেড়েছে, ঝরে পড়া কমেছে। কিন্তু শিক্ষা যদি সত্যিকার অর্থে সমতার প্রতীক হতে চায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য সমান পরীক্ষার পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি শিশু যতই প্রস্তুত থাকুক না কেন, ৪০ ডিগ্রির তাপমাত্রায় বসে তার মস্তিষ্ক একইভাবে কাজ করবে না—এখন সেই বাস্তবতার পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে।
জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী বর্তমান ও আগের প্রজন্ম। অথচ এর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক মূল্য দিতে হচ্ছে শিশু ও তরুণদের। তারা এমন এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে, যেখানে প্রশ্নপত্রের পাশাপাশি লড়তে হচ্ছে ক্রমবর্ধমান উত্তাপের সঙ্গেও। শিক্ষা যদি ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যম হয়, তাহলে সেই দরজার সামনে তাপদাহকে প্রহরী হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাখা কোনো সভ্য সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রমানন লক্ষ্মীনারায়ণ 



















