আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে আবারও ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪৬টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ৬৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নতুন এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে আবারও উদ্বেগ তৈরি করেছে প্রাণঘাতী ভাইরাস ইবোলাকে ঘিরে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইবোলা প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে। সে সময় বর্তমান দক্ষিণ সুদান ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে একাধিক রহস্যজনক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। পরে কঙ্গোর ইবোলা নদীর নাম অনুসারে ভাইরাসটির নাম রাখা হয় ‘ইবোলা’।
ইবোলা কী এবং কীভাবে ছড়ায়
ইবোলা মূলত এক ধরনের ভাইরাসজনিত মারাত্মক রোগ। এর মধ্যে ইবোলা ভাইরাস, সুদান ভাইরাস ও বান্ডিবুগিও ভাইরাস বড় ধরনের সংক্রমণের জন্য দায়ী। গবেষকদের ধারণা, ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। এছাড়া বানর ও এপের মতো প্রাণীর শরীরেও ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে।

মানুষ আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, বমি, শরীরের তরল বা দূষিত বস্তু স্পর্শ করলে সংক্রমিত হতে পারেন। সাধারণত সংক্রমণের দুই দিন থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। জ্বর, শরীরব্যথা, দুর্বলতা ও গলাব্যথা দিয়ে শুরু হলেও গুরুতর অবস্থায় বমি, ডায়রিয়া, খিঁচুনি এবং অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক রক্তক্ষরণ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ইবোলার গড় মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবে তা ২৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্তও পৌঁছেছে। বর্তমানে শুধু ইবোলা ভাইরাস প্রজাতির জন্য টিকা ও চিকিৎসা রয়েছে।
ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব
২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকায় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাব ঘটে। গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়ায়। এ সময় ২৮ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং ১১ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
সংক্রমণ পরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও স্পেনেও পৌঁছায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্তরা ছিলেন ভ্রমণকারী বা চিকিৎসাকর্মী। গবেষকদের ধারণা, গিনির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক শিশুর আক্রান্ত ফলখেকো বাদুড়ের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমেই ওই প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল।
কঙ্গো ও উগান্ডার বড় সংকট
২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে দ্বিতীয় বৃহত্তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব ঘটে। উত্তর কিভু, দক্ষিণ কিভু ও ইতুরি প্রদেশে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা যায়। কিছু সংক্রমণ উগান্ডাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
সে সময় ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং ২ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৬৬ শতাংশ। নতুন যে প্রাদুর্ভাবের খবর এসেছে, সেটিও ইতুরি অঞ্চলে, যা উগান্ডা সীমান্তের কাছাকাছি। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে কঙ্গোতে এক ডজনের বেশি ইবোলা প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।
উগান্ডার অভিজ্ঞতা
২০০০ থেকে ২০০১ সালে উগান্ডায় বড় ধরনের আরেকটি প্রাদুর্ভাব ঘটে। সেখানে ৪২৫ জন আক্রান্ত হন এবং ২২৪ জন মারা যান। এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ছিল সুদান ভাইরাস।

তবে দ্রুত জনসচেতনতা তৈরি এবং গুজব প্রতিরোধমূলক প্রচারণার কারণে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। এরপরও উগান্ডায় একাধিকবার ইবোলা ফিরে এসেছে।
প্রথম শনাক্ত হওয়ার গল্প
১৯৭৬ সালে সুদান ও তৎকালীন জায়ারে প্রথম ইবোলার প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হয়। সুদানে অন্তত ১৫১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। কঙ্গোতে ইবোলা নদীর কাছাকাছি এলাকায় ২৮০ জন মারা যান।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, একটি তুলার কারখানায় বাদুড় থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে থাকতে পারে। যদিও এর সুনির্দিষ্ট উৎস এখনো নিশ্চিত নয়।
একই বছরে যুক্তরাজ্যে এক ল্যাবকর্মী দূষিত উপাদানে দুর্ঘটনাবশত আহত হয়ে আফ্রিকার বাইরে প্রথম ইবোলা রোগী হিসেবে শনাক্ত হন। পরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর আফ্রিকার বাইরে খুব কম সংখ্যক ইবোলা সংক্রমণ রেকর্ড হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















