সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও টানা বৃষ্টির কারণে ধানের ব্যাপক ক্ষতির পর এবার গবাদিপশুর খাদ্য সংকট নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা। বিশেষ করে গরু-মহিষের প্রধান খাদ্য খড় সংগ্রহ করতে না পারায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
কৃষকদের ভাষ্য, হাওরাঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে গবাদিপশু সরাসরি জড়িত। জমি চাষ, পরিবারের আয় এবং প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা পূরণে গরু ও মহিষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এ বছর জলাবদ্ধতা ও আগাম বন্যার কারণে ধান কাটার পর খড় শুকিয়ে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। পানিতে ডুবে থাকা জমি থেকে যে সামান্য খড় তোলা গেছে, তার বেশিরভাগই পচে গেছে।
খড়ের ওপর নির্ভরতা বেশি
জেলার ১২টি উপজেলার কৃষকেরা জানান, সুনামগঞ্জে সাধারণত গবাদিপশুর প্রায় ৮৫ শতাংশ খাদ্য আসে ধানের খড় থেকে। শুকনো মৌসুমে কিছুটা ঘাস পাওয়া গেলেও বছরের প্রায় ছয় মাস পশুখাদ্যের প্রধান ভরসা থাকে সংরক্ষিত খড়।
এ বছর সেই মজুত প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই এখন গবাদিপশু ধরে রাখার পরিবর্তে কম দামে বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা করছেন।

দুশ্চিন্তায় খামারিরা
সদর উপজেলার জানিগাঁও গ্রামের কৃষক শামসু মিয়া জানান, তাঁর নয়টি গরু রয়েছে। প্রতি বছর বৈশাখ মৌসুমে তিনি পর্যাপ্ত খড় সংগ্রহ করে রাখেন। কিন্তু এবার বন্যার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, অনেক কষ্টে কিছু পচা খড় শুকিয়ে রাখা গেলেও তা দুই মাসের বেশি চলবে না। এরপর গবাদিপশুর খাবার কীভাবে জোগাড় হবে, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার সলফ গ্রামের কৃষক রুহুলও একই সংকটের কথা জানান। তিনি বলেন, এ বছর খড় বা অন্য কোনো পশুখাদ্য মজুত করা যায়নি। ফলে গরুর একটি অংশ বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা করতে হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, শুধু কয়েকজন নয়, জেলার বহু পরিবার একই অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। খাদ্য সংকটের কারণে অনেকে ইতোমধ্যে কম দামে গরু বিক্রি শুরু করেছেন।

জানিগাঁও গ্রামের রুকনউদ্দিন বলেন, পশুখাদ্যের অভাব চলতে থাকলে আরও অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে গবাদিপশু বিক্রি করবেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে হাওরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারি সহায়তার দাবি
কৃষক ও খামারিরা দ্রুত সরকারি সহায়তা চেয়েছেন। তাদের মতে, বিকল্প খাদ্য সরবরাহ ও বিশেষ প্রণোদনা না দিলে অনেক পরিবার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সুনামগঞ্জে সাধারণত বছরে প্রায় ১৮ লাখ টন খড় উৎপাদিত হয়। কিন্তু এবার বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ফসলের ক্ষতির কারণে পশুখাদ্য সংকট ইতোমধ্যেই দেখা দিতে শুরু করেছে। তিনি কৃষকদের শুধু খড়ের ওপর নির্ভর না করে ভুসি, চাউলের কুঁড়া ও বাণিজ্যিক খাদ্য ব্যবহার করার পরামর্শ দেন, যাতে গবাদিপশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা যায়।
হাওরাঞ্চলে খড় সংকট ও গবাদিপশুর খাদ্য সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় কৃষকদের চোখ এখন সরকারি সহায়তা ও দ্রুত সমাধানের দিকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















