ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করার সময় ভ্লাদিমির পুতিন সম্ভবত বিশ্বাস করেছিলেন, এই যুদ্ধ রাশিয়াকে আবারও বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনবে। পশ্চিমা প্রভাব দুর্বল হবে, আর মস্কো নতুন বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। কিন্তু চার বছরেরও বেশি সময় পর বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ উল্টো। যুদ্ধ কেবল সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ধীরে ধীরে রাশিয়ার কূটনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করেছে, দীর্ঘদিনের মিত্রদের দূরে ঠেলে দিয়েছে এবং মস্কোর ওপর নির্ভরতার রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বহু বছর ধরে রাশিয়া সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলগুলোতে এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ আধিপত্য বজায় রেখেছিল। মধ্য এশিয়া, ককেশাস কিংবা পূর্ব ইউরোপ—সব জায়গায় মস্কোর প্রভাব ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সেই কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। কাজাখস্তান, যা দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার নিরাপত্তা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, এখন অনেক বেশি সতর্ক। কারণ পুতিন যেভাবে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ঠিক একই ধরনের ইঙ্গিত অতীতেও কাজাখস্তান সম্পর্কে দিয়েছেন। ফলে আস্তানার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে, অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে বিপজ্জনক হতে পারে।
এই উদ্বেগই কাজাখ নেতৃত্বকে নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজতে বাধ্য করেছে। তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা কিংবা ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলগুলোকে স্বীকৃতি না দেওয়া—এসব পদক্ষেপ ছিল কেবল প্রতীকী নয়, বরং কৌশলগত বার্তা। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করেও তারা বিকল্প পথ খোলা রাখতে চাইছে।
আরও বড় ধাক্কা এসেছে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান ইস্যুতে। দীর্ঘদিন ধরে মস্কো দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে নিজেকে অঞ্চলের অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু নাগোর্নো-কারাবাখ সংকটে সেই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ে। আজারবাইজানের সামরিক অভিযানের সময় রুশ শান্তিরক্ষীরা কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। আর্মেনিয়ার দৃষ্টিতে এটি ছিল সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা। ফলাফলও দ্রুত দেখা যায়—ইয়েরেভান রাশিয়া-নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা জোট থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে এবং ফ্রান্স ও ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
অন্যদিকে আজারবাইজানের সঙ্গেও সম্পর্ক অবনতির দিকে গেছে। একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় মস্কোর দীর্ঘ নীরবতা বাকুকে ক্ষুব্ধ করেছে। কয়েক বছর আগেও দক্ষিণ ককেশাসে রাশিয়ার কর্তৃত্ব প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। এখন সেখানে মস্কোকে বারবার প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যেও রাশিয়ার প্রভাব কমে এসেছে স্পষ্টভাবে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদকে টিকিয়ে রাখতে মস্কো বিপুল সামরিক ও কূটনৈতিক বিনিয়োগ করেছিল। সেই হস্তক্ষেপ একসময় পুতিনের পররাষ্ট্রনীতির সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হতো। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতাকে এমনভাবে ব্যস্ত করে ফেলেছে যে নতুন সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আর আগের মতো নেই। বিদ্রোহীদের আকস্মিক অগ্রযাত্রার সময় মস্কো কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আসাদকে আশ্রয় দিলেও রাশিয়া সিরিয়ায় তার বহু বছরের বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত কৌশলগত লাভ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
আফ্রিকাতেও একই চিত্র। একসময় ওয়াগনার গ্রুপকে ব্যবহার করে রাশিয়া বিভিন্ন দেশে প্রভাব বিস্তার করছিল। নিরাপত্তা সহায়তার বিনিময়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও খনিজ সম্পদের প্রবেশাধিকার—এই মডেল কিছু সময়ের জন্য কার্যকরও হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই উপস্থিতি স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। মালি কিংবা সাহেল অঞ্চলে রুশ ভাড়াটে বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দেখিয়েছে যে সামরিক শক্তি দিয়ে দ্রুত প্রভাব অর্জন সম্ভব হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
ইউরোপেও রাশিয়ার রাজনৈতিক বন্ধু কমে যাচ্ছে। হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান দীর্ঘদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে মস্কোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কণ্ঠ হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। কিন্তু তার বিদায় রাশিয়ার জন্য বড় প্রতীকী ক্ষতি। সার্বিয়াও ধীরে ধীরে অবস্থান বদলাচ্ছে। বেলগ্রেড এখন একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে এবং ইউক্রেনের দিকেও দরজা খোলা রাখছে। অর্থাৎ পুতিনের ঘনিষ্ঠ অংশীদারেরাও ভবিষ্যতের হিসাব কষছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কও যতটা সমমর্যাদার জোট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, বাস্তবে তা নয়। বেইজিং রাশিয়াকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি ঠিকই, কিন্তু তারা নিজেদের স্বার্থের বাইরে গিয়ে মস্কোর জন্য ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত নয়। চীন প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাণিজ্যিক সুযোগ দিচ্ছে, বিনিময়ে সস্তায় জ্বালানি পাচ্ছে। ফলে সম্পর্কটি ক্রমশ এমন এক নির্ভরতায় রূপ নিচ্ছে, যেখানে রাশিয়ার দরকষাকষির ক্ষমতা সীমিত।
আজ পুতিনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের একজন উত্তর কোরিয়া। কিন্তু এটিও কোনো আদর্শিক মৈত্রী নয়; বরং পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা ও পশ্চিমবিরোধিতার ওপর দাঁড়ানো একটি লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক। এটি রাশিয়ার বৈশ্বিক অবস্থানের শক্তি নয়, বরং সংকটের প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়াকে কেবল অর্থনৈতিক চাপ বা সামরিক ক্ষতির মুখে ফেলেনি; এটি মস্কোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—বিশ্বস্ততা—ক্ষয় করেছে। একসময় রাশিয়া নিজেকে এমন এক শক্তি হিসেবে তুলে ধরত, যে মিত্রদের পাশে দাঁড়ায় এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। এখন অনেক দেশই বুঝতে পারছে, রাশিয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা নিরাপত্তা নয়, বরং অনিশ্চয়তা ডেকে আনতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্র, জ্বালানি সম্পদ কিংবা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন এখনও রাশিয়াকে বড় শক্তি হিসেবে ধরে রেখেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কেবল সামরিক সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। প্রভাব টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আস্থা, নির্ভরযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ঠিক এই জায়গাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
নিনা এল. ক্রুশ্চেভা 



















