আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, সরকারকে একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ঋণের চাপ সামাল দেওয়া, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিকে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে কঠিন আর্থিক সংকটগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে বড় প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন।
উপস্থাপনায় বলা হয়, অতীতের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির হিসাব ধরলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ঘাটতি থেকে যেতে পারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদায়ের ধীরগতিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাকি সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে রাজস্ব বাড়ানো বাস্তবে খুব কঠিন হয়ে পড়বে।
বেতন বাড়লে বাড়বে চাপ
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নিম্নতম ও সর্বোচ্চ বেতনে বড় ধরনের বৃদ্ধি এলে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হলে ভর্তুকি, উন্নয়ন প্রকল্প ও অন্যান্য সামাজিক খাতে বরাদ্দ কমে যেতে পারে। কারণ একবার বেতন কাঠামো চালু হলে তা থেকে সরে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কর ছাড় নিয়ে দ্বন্দ্ব
আলোচনায় কর ছাড় ও কর অব্যাহতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বলা হয়েছে, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম কম হলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ কর ছাড়ের মাধ্যমে হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বড় করপোরেট খাতের কিছু কর সুবিধা ধীরে ধীরে কমানো যেতে পারে। তবে প্রবাসী আয় ও সাধারণ চাকরিজীবীদের কিছু সুবিধা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ঋণের বোঝা ও আইএমএফের শর্ত
বাংলাদেশের বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে সরকারের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। এতে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক কর্মসূচির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিভিন্ন সংস্কার শর্তও সরকারকে বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে উঠছে বলে মত দিয়েছেন বক্তারা।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও শঙ্কা
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, স্কুলের খাবার ও বিনা মূল্যের পোশাক কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচন, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব কর্মসূচি কার্যকর রাখতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও বাড়াতে হবে।
অর্থনীতি ও রাজনীতির দ্বৈত চাপ
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, একদিকে অর্থনৈতিক সংস্কার ও আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজন, অন্যদিকে জনগণের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের চাপ—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আগামী বাজেট তৈরি করতে হবে সরকারকে।
তাদের মতে, সামনের বাজেট শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষাও হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















