ভারতের বিরোধী রাজনীতিতে নতুন করে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধাক্কা, অন্যদিকে তামিলনাড়ুতে এম কে স্টালিনের রাজনৈতিক দুর্বলতা— সব মিলিয়ে বিরোধী জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। এর মধ্যেই কংগ্রেসের নতুন রাজনৈতিক অবস্থান জোটের ভেতরে সম্পর্ক আরও জটিল করে তুলেছে।
তামিলনাড়ুতে অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া সি জোসেফ বিজয়ের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের সময় লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর উপস্থিতি বড় রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। এর মাধ্যমে কার্যত কংগ্রেস ও ডিএমকের দূরত্ব প্রকাশ্যে এসেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
কংগ্রেস অবশ্য বলছে, তাদের এই অবস্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিজেপি এবং এআইএডিএমকের প্রভাব ঠেকানো। তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন আস্থা ভোটে এআইএডিএমকের একাংশ বিজয় সরকারের পাশে দাঁড়ায়।
জোটে অস্বস্তির ইঙ্গিত
কংগ্রেস নেতারা দাবি করছেন, সংসদে বিরোধী ঐক্য এখনও বহাল আছে এবং ডিএমকের সঙ্গে যোগাযোগও চলছে। কিন্তু বাস্তবে জোটের শরিকদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে বলেই স্পষ্ট হচ্ছে।
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব সামাজিক মাধ্যমে এমন মন্তব্য করেছেন, যা রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছে। তিনি বলেন, কঠিন সময়ে তারা একে অপরকে ছেড়ে যাওয়ার রাজনীতি করেন না। এই বক্তব্যকে অনেকে কংগ্রেসের প্রতি পরোক্ষ বার্তা হিসেবে দেখছেন।
কেন্দ্রের জন্য শক্তিশালী কংগ্রেস, রাজ্যে নয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েছে কংগ্রেস। আঞ্চলিক দলগুলো চায়, কেন্দ্রের রাজনীতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেস শক্ত অবস্থানে থাকুক। কিন্তু নিজেদের রাজ্যে তারা কংগ্রেসকে শক্তিশালী হতে দিতে রাজি নয়।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজ্যে জোট করেও কংগ্রেস সংগঠনগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কংগ্রেসের ভেতরেও এখন এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, শুধুমাত্র জোটের উপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।
দলের একাধিক নেতা মনে করছেন, বিজেপি যেভাবে ধীরে ধীরে বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে, কংগ্রেস সেই জায়গায় উল্টো সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দলের অবস্থান আগের তুলনায় অনেক দুর্বল।

মমতার প্রস্তাব ঘিরেও বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের ধাক্কার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি-বিরোধী বৃহত্তর ফ্রন্ট তৈরির আহ্বান জানান। সেখানে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলা হয়।
কিন্তু কংগ্রেসের একাংশ এই প্রস্তাবকে ভালোভাবে নেয়নি। দলের নেতারা মনে করছেন, তৃণমূল এখন আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই বলেই নতুন সমর্থন খুঁজছে।
রাহুলের বার্তায় দ্বৈত সুর
রাহুল গান্ধী একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন, অন্যদিকে আবার বলেছেন, শেষ পর্যন্ত বিজেপির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে পারবে শুধুমাত্র কংগ্রেসই।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, কংগ্রেস এখন নিজেদের জাতীয় বিকল্প শক্তি হিসেবে পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগোতে চাইছে। তবে সেই পথ সহজ নয়। কারণ বর্তমানে বিজেপিই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হয়ে উঠেছে এবং আঞ্চলিক দলগুলোও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে আলাদা কৌশল নিচ্ছে।
২০২৯ সামনে রেখে বড় চ্যালেঞ্জ
আগামী লোকসভা নির্বাচন সামনে রেখে কংগ্রেসের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— একদিকে নিজেদের জাতীয়ভাবে পুনর্গঠন করা, অন্যদিকে আঞ্চলিক শরিকদের আস্থা ধরে রাখা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে সামলানোই আগামী কয়েক বছরে বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















