০১:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে কর অটোমেশনে এনবিআরের বড় ডিজিটাল সংস্কার উদ্যোগ

বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অভিযোগ দুটি: করদাতার সংখ্যা কম এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতার ঘাটতি বেশি। এই বাস্তবতার মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, অনলাইন রিটার্ন, ডেটা নির্ভর অডিট এবং কাগজবিহীন ভ্যাট ব্যবস্থার দিকে এগোতে চাইছে। এনবিআরের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন এখন শতভাগ ই-রিটার্নে নেওয়ার পরিকল্পনা এগিয়েছে, ভ্যাট রিটার্নও অনলাইনের দিকে যাচ্ছে, আর অডিট নির্বাচনে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বদলে ডেটাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে।

কর প্রশাসনের জন্য এটি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামো বদলের বিষয়। এতদিন করদাতা ও কর কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, হয়রানি, দরকষাকষি এবং অস্বচ্ছতার সুযোগ তৈরি করত। যদি রিটার্ন জমা, রিফান্ড, অডিট নির্বাচন, ভ্যাট তথ্য এবং উৎসে করের হিসাব ডিজিটালভাবে যুক্ত হয়, তাহলে করদাতার জন্য নিয়ম পরিষ্কার হতে পারে এবং কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবেচনার সুযোগ কমতে পারে।

জিডিপি কী, যেভাবে হিসাব করা হয়
অটোমেশন কেন জরুরি

বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় কম। অর্থনীতির আকার বড় হলেও করের আওতায় বাস্তব আয় ও লেনদেনের বড় অংশ ঠিকভাবে আসে না। নগদ লেনদেন, অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা, ভুয়া কাগজপত্র, কম মূল্য দেখানো আমদানি এবং দুর্বল তথ্য আদানপ্রদান রাজস্ব সংগ্রহে বাধা তৈরি করে। অটোমেশন এসব সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়, কিন্তু এটি কর ফাঁকি ধরার একটি শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।

স্বয়ংক্রিয় অডিট নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ কারণ এতে কোন রিটার্ন পরীক্ষা করা হবে তা নির্ধারণে ঝুঁকি বিশ্লেষণ, লেনদেনের অসঙ্গতি, ঘোষিত আয় ও জীবনযাত্রার ব্যবধান, ব্যাংকিং তথ্য এবং ব্যবসায়িক নথির মিল-অমিল দেখা যায়। এতে সৎ করদাতা অযথা হয়রানি থেকে কিছুটা রক্ষা পেতে পারেন, আর ঝুঁকিপূর্ণ রিটার্ন দ্রুত চিহ্নিত করা যায়।

চ্যালেঞ্জ কোথায়

তবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু সফটওয়্যার চালু করলেই সংস্কার হয় না। অনেক ডিজিটাল সেবা কাগজের কাজের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলতে থাকে, ফলে দ্বৈত ঝামেলা তৈরি হয়। অনেক ব্যবসা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান, এখনো নিয়মিত ডিজিটাল হিসাব রাখে না। গ্রামীণ করদাতা বা প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত নাগরিকদের জন্য অনলাইন রিটার্ন সহজ না হলে অটোমেশন আবার নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।

লঘুদণ্ড দিয়ে এনবিআর কর্মকর্তা সেহেলার বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার - Udyog News
এর সঙ্গে আছে ডেটা নিরাপত্তার প্রশ্ন। করদাতার আয়, ব্যাংকিং, সম্পদ ও ব্যবসার তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এসব তথ্য এক জায়গায় যুক্ত হলে সাইবার নিরাপত্তা, অনুমোদিত প্রবেশাধিকার এবং তথ্য অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে মানুষের আস্থা কমে যাবে।

সফলতার শর্ত

কর অটোমেশন সফল করতে হলে তিনটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, সিস্টেমকে ব্যবহারবান্ধব করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন ও প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। তৃতীয়ত, কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অটোমেশন যদি শুধু কর আদায়ের চাপ বাড়ায়, কিন্তু সেবা ও স্বচ্ছতা না বাড়ায়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ তৈরি হবে। আর যদি প্রযুক্তি করদাতাকে দ্রুত সেবা, কম হয়রানি এবং স্পষ্ট নিয়ম দেয়, তাহলে রাজস্ব সংস্কার বাস্তবে ফল দিতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আগামী কয়েক বছরে রাজস্ব সংগ্রহ বড় নীতিগত ইস্যু হয়ে থাকবে। সেই কারণে এনবিআরের অটোমেশন উদ্যোগকে শুধু আইটি প্রকল্প হিসেবে নয়, নাগরিক সেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পরীক্ষা হিসেবে দেখা উচিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশে কর অটোমেশনে এনবিআরের বড় ডিজিটাল সংস্কার উদ্যোগ

১০:৫৭:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অভিযোগ দুটি: করদাতার সংখ্যা কম এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতার ঘাটতি বেশি। এই বাস্তবতার মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, অনলাইন রিটার্ন, ডেটা নির্ভর অডিট এবং কাগজবিহীন ভ্যাট ব্যবস্থার দিকে এগোতে চাইছে। এনবিআরের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন এখন শতভাগ ই-রিটার্নে নেওয়ার পরিকল্পনা এগিয়েছে, ভ্যাট রিটার্নও অনলাইনের দিকে যাচ্ছে, আর অডিট নির্বাচনে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বদলে ডেটাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে।

কর প্রশাসনের জন্য এটি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামো বদলের বিষয়। এতদিন করদাতা ও কর কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, হয়রানি, দরকষাকষি এবং অস্বচ্ছতার সুযোগ তৈরি করত। যদি রিটার্ন জমা, রিফান্ড, অডিট নির্বাচন, ভ্যাট তথ্য এবং উৎসে করের হিসাব ডিজিটালভাবে যুক্ত হয়, তাহলে করদাতার জন্য নিয়ম পরিষ্কার হতে পারে এবং কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবেচনার সুযোগ কমতে পারে।

জিডিপি কী, যেভাবে হিসাব করা হয়
অটোমেশন কেন জরুরি

বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় কম। অর্থনীতির আকার বড় হলেও করের আওতায় বাস্তব আয় ও লেনদেনের বড় অংশ ঠিকভাবে আসে না। নগদ লেনদেন, অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা, ভুয়া কাগজপত্র, কম মূল্য দেখানো আমদানি এবং দুর্বল তথ্য আদানপ্রদান রাজস্ব সংগ্রহে বাধা তৈরি করে। অটোমেশন এসব সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়, কিন্তু এটি কর ফাঁকি ধরার একটি শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।

স্বয়ংক্রিয় অডিট নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ কারণ এতে কোন রিটার্ন পরীক্ষা করা হবে তা নির্ধারণে ঝুঁকি বিশ্লেষণ, লেনদেনের অসঙ্গতি, ঘোষিত আয় ও জীবনযাত্রার ব্যবধান, ব্যাংকিং তথ্য এবং ব্যবসায়িক নথির মিল-অমিল দেখা যায়। এতে সৎ করদাতা অযথা হয়রানি থেকে কিছুটা রক্ষা পেতে পারেন, আর ঝুঁকিপূর্ণ রিটার্ন দ্রুত চিহ্নিত করা যায়।

চ্যালেঞ্জ কোথায়

তবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু সফটওয়্যার চালু করলেই সংস্কার হয় না। অনেক ডিজিটাল সেবা কাগজের কাজের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলতে থাকে, ফলে দ্বৈত ঝামেলা তৈরি হয়। অনেক ব্যবসা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান, এখনো নিয়মিত ডিজিটাল হিসাব রাখে না। গ্রামীণ করদাতা বা প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত নাগরিকদের জন্য অনলাইন রিটার্ন সহজ না হলে অটোমেশন আবার নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।

লঘুদণ্ড দিয়ে এনবিআর কর্মকর্তা সেহেলার বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার - Udyog News
এর সঙ্গে আছে ডেটা নিরাপত্তার প্রশ্ন। করদাতার আয়, ব্যাংকিং, সম্পদ ও ব্যবসার তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এসব তথ্য এক জায়গায় যুক্ত হলে সাইবার নিরাপত্তা, অনুমোদিত প্রবেশাধিকার এবং তথ্য অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে মানুষের আস্থা কমে যাবে।

সফলতার শর্ত

কর অটোমেশন সফল করতে হলে তিনটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, সিস্টেমকে ব্যবহারবান্ধব করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন ও প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। তৃতীয়ত, কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অটোমেশন যদি শুধু কর আদায়ের চাপ বাড়ায়, কিন্তু সেবা ও স্বচ্ছতা না বাড়ায়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ তৈরি হবে। আর যদি প্রযুক্তি করদাতাকে দ্রুত সেবা, কম হয়রানি এবং স্পষ্ট নিয়ম দেয়, তাহলে রাজস্ব সংস্কার বাস্তবে ফল দিতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আগামী কয়েক বছরে রাজস্ব সংগ্রহ বড় নীতিগত ইস্যু হয়ে থাকবে। সেই কারণে এনবিআরের অটোমেশন উদ্যোগকে শুধু আইটি প্রকল্প হিসেবে নয়, নাগরিক সেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পরীক্ষা হিসেবে দেখা উচিত।